ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৩৩:০১
বার্তা »
  

৫ মহাদেশ থেকে ৩ জন করে ১৫ বিচারকের সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক


 

অতি সম্প্রতি ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ব্রাস্লেস, জেনেভা এবং আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালতের সদর দপ্তর দি হেগ সফর করে এসেছি। জানামতে, রূয়ান্ডাতে অবস্থিত আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক সংখ্যা হচ্ছে সর্বমোট ২৫ জন, প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আর্ন্তজাতিক আদালতের সংখ্যা হচ্ছে ও ২৫, কম্বোডিয়ার আদালতের বিচারক সংখ্যা (৬ জন রির্জাব বিচারক সহ) মোট ২৩ জন, আফ্রিকার সেরালীয়নে অবস্থিত আদালতের বিচারক সংখ্যা ১২ জন।

 

ক. দেশে বিদেশে প্রতিবাদ উঠেছে রাজনৈতিক কারণেই সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার করছে। সরকার যদি সত্যি ন্যয় বিচার করতে চায় তাহলে পৃথিবীর পাঁচটি মহাদেশ থেকে তিন জন করে ১৫ বিচারক নিয়োগ করা হোক। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হোক। সরকার ও অভিযুক্ত পক্ষকে তাদের পছন্দমত বিদেশী আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক। বিচার ঢাকা অথবা দি হেগে হতে পারে। আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় এ ব্যাপারে অর্থায়নেও রাজি হতে পারে। কম্বোডিয়াতে যে বিচার হচ্ছে তার ব্যয় ভার বহন করছে জাপান সরকার । প্রায় ১৭ মাস ধরে আটককৃত ৭ জন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ-যাদের অনেকেরই বয়স ৭০-এর উর্ধ্বে তাদের জামিনের ও ব্যবস্থা করা হোক। এ রকম একটা বিচার হলে তা দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। এ ইস্যুতে জাতি যে বিভক্ত হয়ে আছে তা দূর করে হয়তো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কোন অবস্থাতেই ন্যায় বিচার পাবেন না। জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার হলে ইতিহাসের একটি অধ্যায় অতিক্রম করে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করা যেতো ।

 

খ. যুদ্ধাপরাধ একটি জঘন্য ও ঘৃণ্য অপরাধ। বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী থেকে থাকলেও (দল, মত, সম্প্রদায় নির্বিশেষে) তার বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। তবে রাজনৈতিক কারণে কাউকে এ অপরাধের বিচারের সম্মুখীন করা হলে তা ঘোরতর অন্যায় হবে। সমস্যার সমাধান না হয়ে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হবে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রধান ২টি বিরোধীদলের সাত জন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে জনাব সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি, সাবেক মন্ত্রী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শীর্ষ স্থানীয় নেতা। জনাব আবদুল আলিম বর্সিয়ান রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জামায়াতের আমীর, সাবেক শিল্প ও কৃষিমন্ত্রী। জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক সমাজকল্যান মন্ত্রী। মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী জামায়াতের নায়েবে আমীর, প্রখ্যাত মুফাসেরে কোরআন এবং দুই দুইবার র্নিবাচিত সংসদ সদস্য। জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং জনাব আবদুল কাদের মোল্লা জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এবং সুপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব । দেশ বিদেশে এ প্রশ্ন উঠেছে সরকার যাদের গ্রেপ্তার করেছে তারা সবাই বিরোধীদলের উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ। বিশেষ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কয়দিন আগেও এ প্রশ্ন তুলেছে। আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, রাজনৈতিক কারণে এ বিচার প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রধান দুই বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এ বিচারকে প্রত্যক্ষাণ করা হয়েছে।

 

 

গ. সাম্প্রতিক কালে রূয়ান্ডা, সিয়েরালিওন, প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া এবং হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে। কম্বোডিয়াতে বিচার চলছে। এই সব বিচারেই জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা ছিলো বা আছে। কিন্তু আমাদের যে বিচার হচ্ছে সেখানে জাতিসংঘের কোন সম্পৃক্ততা নেই। এর আগে যুদ্ধাপরাধের যত বিচার হয়েছে সেখানে সামরিক ব্যক্তিদের বিচার হয়েছে। অথবা যারা ওই সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন তাদের বিচার হয়েছে। বাংলাদেশেই প্রথম এমন ব্যক্তিদের বিচার হচ্ছে যারা সামরিক বাহিনীতে ছিলেন না বা ক্ষমতায়ও ছিলেন না।

 

ঘ. দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক আইনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। রোম সংবিধি হয়েছে ১৯৯৮ সালে এটা কার্যকর হয়েছে ২০০১ সালে। বাংলাদেশ এতে স্বাক্ষর করেছে ২০১০ সালে । এ আইন একটা যৌক্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর একটি গ্রহনযোগ্য আন্তর্জাতিক মান আছে। দুই ভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে ঃ কোনটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সম্প্রদায় মিলে, আর কোন কোনটা হচ্ছে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিকভাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একবাক্যে বলছে বাংলাদেশে প্রণীত ১৯৭৩ সালের আইন আন্তর্জাতিক মানের অনেক অনেক নীচে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ট্রান্সিশনাল জাস্টিস, ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন, ওপেন সোসাইটি জাস্টিস সবাই একযোগে বলছে, এ আইনে বিচার হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করা হবে না। এদের মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সরাসরি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে আইনটি সংশোধন করতে বলেছে। জাতিসংঘের অফিস অব দি হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস ইন জেনেভা ২০০৯ সালের জুন মাসে বাংলাদেশকে চিঠি দিয়ে বলেছে ঃ ১৯৭৩ সালের আইনে বিচার হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা হবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত মিঃ স্টিফেন র‌্যাপ ও অনুরূপ মতামত দিয়েছেন। সবাই আইন পরিবর্তনের কথা বলছে। বাংলাদেশ সরকার আইন পরিবর্তন করেনি। সামান্য যে পরিবর্তন করেছে এটাকে বলা যায় কসমেটিক। তা ছাড়া ১৯৭৩ সালে আইনটি করা হয়েছিলো বিদেশী নাগরিকদের জন্য। যেহেতু বিদেশী নাগরিকদের জন্য এই আইন করা হয়েছিলো সেহেতু তাদের কোন মৌলিক অধিকার সংরক্ষন করা হয়নি। বাংলাদেশের কোন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে তিনি হাইকোর্টে যেতে পারেন। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী একজন নাগরিক ও তার মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের জন্য হাইকোর্টের আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যারা কারাগারে আটক আছেন তারা হাইকোর্টে যেতে পারবেন না। এ নিয়েও বাংলাদেশ সরকার যথেষ্ট সমালোচিত হচ্ছে। ৪০ বছর পর আমরা আমাদের নাগরিকদের বিচার করছি। তাদের কোন মৌলিক অধিকার নেই। সভ্য সমাজে এটা কল্পনাও করা যায় না।

 

ঙ. বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আইন মানছে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দেশীয় আইন ও প্রযোজ্য নয়। সর্বোচ্চ আইন সংবিধানতো নয়ই। আমাদের দেশে প্রচলিত দুইটি প্রধান আইন আছে ঃ একটা ফৌজদারী কার্যবিধি আরেকটি সাক্ষ্য আইন। এর কোনটাই মানা হচ্ছে না। বিচারকরা তাদের তৈরি বিধি অনুযায়ীই বিচার করবেন। এজন্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুবই শঙ্কিত, চিন্তিত যে বিচারের নামে অবিচার হবে।

 

চ. ট্রাইবুনালের তিন জন সম্মানিত বিচারক আছেন। মাননীয় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এ সত্যটা প্রমানিত হয়েছে তিনি যুদ্ধাপরাধের তদন্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সব দেশে (এমনকি কমিউনিস্ট দেশেও) স্বীকৃত যে, যিনি তদন্তের সঙ্গে জড়িত থাকেন তিনি বিচারক হতে পারবেন না। তারপরও মাননীয় চেয়ারম্যান অবলীলাক্রমে বিচারকাজ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। এ বিচার দেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না, বিদেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না। কিছুদিন আগে ঘাতক দালাল কমিটির একশীর্ষ নেতা বলেছেন এই ট্রাইবুনাল ঠুঠো জগন্নাথ” । সরকার পক্ষীয় উকিলদের উপরও আস্থা নেই। সতরাং এই ট্রাইবুনাল বিভিন্ন কারনে সকলের আস্থা হারিয়েছে।

 

ছ. বিশ্বের অন্যান্য ট্রাইব্যুনালে দেখা গেছে অভিযোগ পত্র আগে থেকেই তৈরি থাকে। গ্রেপ্তারের পরপরই অভিযোগ গঠন করা হয়। নুয়েমবার্গ থেকে যুগোস্লাভিয়া, সিয়েরালিওন থেকে কম্বোডিয়া বিগত ৬০ বছরের দীর্ঘ সময়ের আর্ন্তজাতিক ট্রাইবুনালে এর অসংখ্য নজীর আছে। সর্বশেষ নজির হচ্ছেঃ বসনীয় সার্ব মিলিটারী কমান্ডার রাটকো ম্লাডিকের (জধঃশড় গষধফরপ) বিচার শুরুর ঘটনা ২০১১ সালের ২৬ মে তাকে সার্বিয়ায় গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের মাত্র ৭ দিনের মাথায় তাকে ৩রা জুন দি হেগের আর্ন্তজাতিক আদালতে হাজির করে ঐদিনই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। গ্রেপ্তারের ১৭ মাস পর বাংলাদেশের ৭ অভিযুক্তদের মাত্র একজনের বিরুদ্ধে গতমাসে অভিযোগ গঠন হয়েছে। বাকীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমান’ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৪০ বছরের পুরাতন অপরাধের তদন্ত দীর্ঘ দেড় বছর অতিবাহিত হয়ে যাবার পরও শেষ হয়না। এসব থেকে এই সত্যেই সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় যে এ বিচারের আসল উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা।

এক্ষেত্রে International Herald Tribune এবং The Economist এর ৮ ও ২৫ নবেম্ভরের প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন দেখা যেতে পারে।

 

লেখকঃ সিনিয়র আইনজীবী