ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৫৫:৫২
বার্তা »
  

আপনারা যাঁদের বৃদ্ধ বলছেন, তাঁদের জন্য ভাবুন


 

বয়স যত বাড়ছে, ততই আমি নিজেও বৃদ্ধত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এবং হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি, বৃদ্ধ লোকদের কী অসুবিধা হতে পারে এবং হচ্ছে। আমাদের যৌবনকালে আমরা যেমন আমাদের মা-বাবার বা অন্য আত্মীয়স্বজনের সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে বুঝতে চাইনি, আজকে আমাদের বৃদ্ধত্বের সময়ে মনে হয়, আমাদের কথা শোনার জন্য কোনো লোক পাওয়া যাবে না। অনেক বৃদ্ধ লোক আমাদের সমাজে এই সেদিন পর্যন্ত অত্যন্ত প্রতাপশালী ছিলেন। আজকে তাঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছেন এবং কখন এই দুনিয়া থেকে চিরদিনের জন্য ছুটি নেবেন, সেই প্রহর আর দিনগুলো গুনছেন। এ জন্যই ভাবি, এই দুনিয়া কিছুই না, শুধু আসা আর যাওয়া। তবে এই আসা-যাওয়ার মধ্যে তাঁরাই ভাগ্যবান, যাঁরা তাঁদের সৃষ্টিকর্তার কাছে ভালো থাকতে পেরেছেন এবং যাঁরা বেশি কষ্ট আর ক্লেশ সহ্য না করে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পেরেছেন। আমাদের ধর্মগ্রন্থ মহান কোরআন মজিদ এই দুনিয়ার যশ-খ্যাতি, ধন-সম্পদ, পদ-পদবি যে কিছুই না, সে সম্পর্কে আল্লাহর বান্দাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বার্ধক্য যত ঘনিয়ে আসে, ততই আল-কোরআনের ওই কথাগুলোর সারমর্ম হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে থাকে।

 

আমাদের আগে-পরে তো আমাদের চেয়ে অনেক বিখ্যাত লোক ছিলেন। অতি অল্প সময়ে তাঁরা সেই বিখ্যাত পথ থেকে সরে গেছেন। তাই ভাবি, যে সামান্যটুকু সময় বান্দা পান, সেই সময়টুকু যেন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যয় করেন এবং কোথা থেকে এলেন, কোথায় যাবেন_এ নিয়ে ভাবেন। বৃদ্ধ লোকদের অনেক সমস্যা হয়, যার মধ্যে শারীরিক শক্তির ক্ষয় অন্যতম। অনেকের অর্থকড়ি থাকে না যে ডাক্তার ও ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় করবেন। আর আজকাল এমন অসুখ-ব্যাধি হচ্ছে, যেগুলোর কোনো ওষুধ নেই। সেই অবস্থায় অর্থ থাকলেই বা কী! আবার অনেক দুর্ভাগা লোক আছেন, যাঁদের ছেলেমেয়ে আছে, কিন্তু মা-বাবাকে দেখার সময় তাদের নেই। তাঁরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। ছেলেমেয়ে আছে, অথচ বৃদ্ধ মা-বাবা একা থাকেন, এমন বহু উদাহরণ আমাদের সমাজে আছে। অনেক লোক সঙ্গীহারা হয়ে আরো দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁদের কয়েকটা দিনের জন্য সান্ত্বনা দেওয়ার লোক পাওয়া যায় না। ডাক্তার বলেছেন একটু হাঁটতে; কিন্তু বৃদ্ধ লোকটাকে হাঁটতে নেবে কে? ঘর থেকে বের হয়ে কোথাও গিয়ে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা বসবেন, সেই শক্তি ও সুযোগ তাঁদের নেই। অথচ তাঁদের অর্থকড়িরও অভাব নেই। কিন্তু সত্য হলো, তাঁদের অর্থ তাঁদের বৃদ্ধকালের অভাব মেটাতে পারছে না।

 

অনেক মানুষ যত বৃদ্ধত্ব ঘনিয়ে আসতে থাকে, ততই আধ্যাত্মিকতার মধ্যে ডুবে যান। তাঁরা অনেকটা ভালো থাকেন। সব জীবেরই মৃত্যু হয়, মানুষেরও হয়। তবে মানুষের ক্ষেত্রে কারো মৃত্যু সহজ হয়, কারো মৃত্যু যন্ত্রণাদায়ক হয়। আল্লাহর প্রিয় অনেক বান্দা শুধু এটাই কামনা করেন, তাঁদের মরণটা যেন সহজ হয়। অনেক বৃদ্ধ লোককে বলতে শুনি, কারো ওপর বোঝা হওয়ার আগে যেন সৃষ্টিকর্তা তাঁদের এ দুনিয়া থেকে নিয়ে যান। এই বলার মধ্যেও একটি সম্ভাব্য শঙ্কা লুকিয়ে আছে। জানেন, কারো ওপর বোঝা হলে সেই বোঝা বহন করার লোক তাঁদের নেই। ছেলেমেয়ে আছে। তবে বোঝা বহন করতে তাদের যেন অনীহা, অযথা নানা কারণে সীমাবদ্ধতা আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মানুষের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে দুটি বড় নিয়ামত হলো_সুস্বাস্থ্য এবং অল্পতে তুষ্ট থাকার মানসিকতা। অবশ্য আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর আমাদের কোনো অধিকার নেই। অনুগ্রহ তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন।

 

আমি যখন দেখি অনেক লোক বেপরোয়া জীবন যাপন করছে, তখন ভাবি, এই লোকগুলো কত অজ্ঞান! একটু ভেবে দেখুন, কিসের জন্য সেই বেপরোয়া জীবন যাপন। রাশি রাশি অর্থকড়ি কি আপনাকে-আমাকে সুখ দিতে পারবে? না, অর্থকড়ি আপনার-আমার ছেলেমেয়েদের একটা পর্যায়ে পেঁৗছে দিতে পারবে! যাঁরা দুর্নীতিতে লিপ্ত আছেন তাঁরা কিসের জন্য ওই কাজটা করছেন, একবার ভেবে দেখুন। দুর্নীতির দায় কি আপনার উত্তরাধিকারীরা নেবে? আমাদের ধর্মগ্রন্থ বলে দিয়েছে_সেই দিন দুনিয়া ভর্তি স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়েও অপরাধী মুক্তি পেতে চাইবে। কিন্তু মুক্তি পাবে না। যারা সরল পথ অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারাই প্রকৃত অর্থে ব্যর্থ মানুষ। অবশ্য এসব কথা অনেক লোকের বুঝে আসবে না, সেটাও জানি। বুঝে আসার জন্য যে বুঝটা দরকার, সেটাও তাদের নেই। আমাদের সমাজে অনেক অজ্ঞান লোককে আমরা জ্ঞানী বলছি, আবার জ্ঞানী লোককে বলছি অসফল-অথর্ব। অন্য অনেক দেশেই পারিবারিক জীবন ভেঙে গেছে। সেখানে বৃদ্ধদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি স্কিম চালু আছে।

 

পারিবারিক জীবনের মধ্য থেকে বৃদ্ধ লোকেরা যদি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে পারেন, তাহলে সেটাই উত্তম। আমাদের দেশেও বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হয়েছে। অন্তত অবহেলিত বৃদ্ধদের জন্য থাকার একটা ঠিকানা মিলল। আমি সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অনুরোধ করব, আপনারা যেভাবে দুস্থ ও অভাবীদের পুনর্বাসনের জন্য কিছু করছেন, তেমনি অবহেলিত বৃদ্ধদের জন্যও কিছু করুন। এই বৃদ্ধরা ডাক্তারের কাছে যেতে পারেন না। তাঁদের ওষুধ কেনার অর্থ নেই। কোন ওষুধ কখন খাবেন সেটা ভুলে যান। তাহলে তাঁদের কে সাহায্য করবে? পরিবারের মধ্যে তাঁদের জায়গা নেই। অনেকের পরিবারই নেই। তাঁদের জন্য কিছু করার মধ্যে, আমি মনে করি, অনেক পুণ্য নিহিত আছে। অনেক অর্থকড়ি ছেলেমেয়েদের হাতে ছেড়ে গেলেও কোনো লাভ নেই। বরং ভালো হবে তাদের উপযুক্ত ও আদর্শ শিক্ষা নিতে সাহায্য করা। অনুপযুক্ত উত্তরাধিকারীরা অতি সহজেই আপনার অর্জিত অর্থকড়ি ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে। হয়তো আপনি সেটা দেখার সুযোগ পাবেন না।

 

বৃদ্ধ বয়সে বন্ধুবান্ধবও দূরে চলে যায়। এর কারণ হলো, বৃদ্ধের বন্ধুরাও বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। আর যোগাযোগ রাখার সেই ক্ষমতাও তাঁরা হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ ওই বৃদ্ধ লোকটির বৈঠকখানায় রীতিমতো বড় বড় আড্ডা জমত। সপ্তাহে-মাসে সবাইকে নিয়ে লাঞ্চ-ডিনার পার্টি হতো। এখন সবই অতীত। আমি যখন হাসপাতালগুলোতে যাই, তখন বৃদ্ধ লোকদের ভোগান্তি দেখলে নিজের মনটা যেন স্তব্ধ হয়ে যেতে চায়। কেউ লাঠি নিয়ে হাঁটছেন, কেউ হুইলচেয়ারে, কেউ কাঁপছেন, কেউ হুঁশ হারিয়ে ফেলছেন। ডাক্তার-নার্স ছোটাছুটি করছেন, সেই সঙ্গে আত্মীয়স্বজনও। কিন্তু তাতে কি সেই বৃদ্ধ লোকদের যন্ত্রণা এতটুকু লাঘব করা যাচ্ছে? হাসপাতালগুলোতে গেলে মনে হবে, অর্ধেক রোগীর বয়সই আমরা যাকে বৃদ্ধকাল বলি সে বয়সের। আর বিশ্বে যত ওষুধ আজতক আবিষ্কৃত হয়েছে, বোধ করি তার অর্ধেকই বয়স্ক আর বৃদ্ধদের জন্য। সে জন্যই বলি, বৃদ্ধকালটা যার যত ছোট হয়, ততই যেন মঙ্গল। আর একটা অনুরোধ করব ছেলেমেয়েদের, আপনারা আপনাদের মা-বাবার প্রতি দরদি হোন। এটাই এই দুনিয়াতে আপনাদের বড় দেনা, আর মা-বাবার বড় পাওনা।

 

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ০৫/১২/১১]