ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৫১:৫৫
বার্তা »
  

দেশকে কোথায় নামিয়ে আনা হচ্ছে?


 

আমাদের মহামান্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের গত তিন বছরের শাসনের ইতিহাস এক দুর্লভ সাফল্য দাবিদারের ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী যেন এক নিক্তি নিয়ে বসে আছেন। তার সরকারের বিরুদ্ধে যে যা-ই বলুক, সেটা তিনি নিক্তিতে তুলে প্রয়োজন হলে হাত দিয়ে ঠেলেও দেখিয়ে দিতে চান যে, জোট সরকারের আমলে এই বিষয়ে কী ঘটেছিল। তার চেয়ে এই দেখুন, আমাদের পাল্লা অনেক কম কিংবা ভারী। আর তিনি যেন ১৯৭২-৭৫ শাসনের ঘোরের ভেতর চলে গেছেন। শুধুই সেখানে ফিরতে চান। তিনি কেবলই পেছনমুখী। সম্মুখে তাকাতে তিনি বড় ভয় পান। সামনে সমস্যার জঞ্জাল। রাষ্ট্রে এত সমস্যা কেন থাকবে? ১৯৭২-৭৫ শাসনকালে শেখ মুজিবুর রহমান সব সমস্যার দাওয়াই তো দিয়েই গিয়েছিলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। অতএব অপরিসীম ক্ষমতা দিয়ে তিনি রক্ষীবাহিনী গঠন করেছিলেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছিল না। তিনি ওপেন জেনারেল লাইসেন্স চালু করেছিলেন। বিরোধী রাজনীতিকেরা বাগে আসছিলেন না। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সব বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ মুজিবের পদচিহ্নে পা ফেলে একে একে অগ্রসর হচ্ছেন। তার এই যাত্রা অগস্তা যাত্রার মতো। এ যাত্রা থেকে অগস্তা মুনি আর কখনো ফিরে আসেননি। প্রধানমন্ত্রী ফিরতে চান কি না জানি না, কিন্তু তিনি বিপদসঙ্কুল পথ ধরেই অগ্রসর হচ্ছেন। ১৯৭২-৭৫ আর ২০১১-১২ সালের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান আছে, সেটি তিনি কল্পনাও করতে চান না। তিনি ভাবতেও চান না ভারতের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও কেন শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। কেন শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র কয়েক দিনের জন্য পরীক্ষামূলক ভারতকে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, কেন তিনি ২৫-৩০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেননি।

 

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের ভাষ্য মতে, বর্তমান সরকার সামরিক জান্তার সাথে এক আঁতাতের সরকার। সে আঁতাতের কারণেই শেখ হাসিনা আবদুল জলিলকে একেবারে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে ছেড়েছেন। আবদুল জলিল নিজেকে পাগল ঘোষণা করেও রেহাই পাননি। শেখ হাসিনা তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। তিনি ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন প্রবীণ আওয়ামী লীগার আবদুর রাজ্জাক-তোফায়েলসহ সবাইকে। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা শেখ হাসিনার বর্তমান চমকের মন্ত্রিসভাকে কচিকাঁচার আসর বলে অভিহিত করেছেন। ইতোমধ্যে মন্ত্রীরা নিজেরাও প্রমাণ দিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষেই এই মন্ত্রিসভা কচিকাঁচার আসর।

 

কাকে দিয়ে যে শুরু করব বুঝে উঠতে পারি না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বলি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলি, পানিসম্পদমন্ত্রী বলি, আইনমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বলি, টেলিফোনমন্ত্রী বলি, নৌপরিবহনমন্ত্রী বলি- সবই কেবল কচিকাঁচায় ভরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: দীপু মনি ভ্রমণবিলাসী। তিনি সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি যে মন্ত্রিপরিষদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাকে দেয়া হবে। তিনি প্রস্ফুটোদ্যম কুসুমের মতো চঞ্চলা কিশোরী। খ্যাতিমান কাউকে দেখলেই অটোগ্রাফের খাতা হাতে ছুটে যান। কী দারুণ!

 

অথচ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। উপমহাদেশের অন্য কোনো রাষ্ট্রের মতো ঔপনিবেশিক সরকারের সাথে আলোচনার টেবিলে বসে এ রাষ্ট্র স্বাধীন হয়নি। এ দেশের কোটি কোটি মানুষ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দখলদার শত্রুদের হারিয়ে দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। অটোগ্রাফ-শিকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সে বিষয়ে কোনো জ্ঞান আছে বলে গত তিন বছরে মনে হয়নি। গত তিন বছরে তিনি ১০২ বার বিদেশ ভ্রমণে গেছেন। ভ্রমণতৃষিতা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্ভবত ভ্রমণতৃষ্ণার কারণেই গিনেস বুক অব রেকর্ডে তার নাম উঠবে। দীপু মনি চিরজীবী হোন।

 

ক্ষমতায় বসার জন্য আবদুল জলিলের ভাষ্য মতে, শেখ হাসিনা যে সামরিক নেতাদের সাথে আঁতাত করেছিলেন, তাদের এখনো তিনি ভালোবেসে পোষেণ। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন যে, ওরা হত্যার জন্য কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগ করেছিল। কী সাংঘাতিক কথা! কিন্তু কোথাও কোথাও প্রধানমন্ত্রী ভারি দয়ার। তিনি তাদের পরম মমতায় ক্ষমা করে দিয়েছেন। না হয় তাকে হত্যার চেষ্টাই করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হত্যা তো আর করেনি। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার কী মানে হয়? ফলে সৈনিক মইন, আমলা ফখরুদ্দীন প্রমুখকে কিছুতেই বিচারের আওতায় আনতে চাননি। বিরোধীদের তরফ থেকে যখন দাবি তোলা হলো যে, এরা যেহেতু আপনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে, অতএব এদের বিচার করুন।

 

মনে হলো, তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী। বললেন, ছয়জনকে ডিঙিয়েই তো আপনি তাকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। তখন খেয়াল করেননি? ভাবটা যেন এমন যে, আপনি ছয়জনকে ডিঙিয়ে সেনাপ্রধান করে অন্যায় করেছিলেন। আমাকে হত্যার চেষ্টা করলেও আমি তাদের বিচারের আওতায় না এনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। এ দিকে দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের নেতা মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর জন্য সরকারের বড় দরদ। তিনি ছিলেন গণতন্ত্র-সংবিধানঘাতী সবচেয়ে বড় হোতাদের অন্যতম। তাকে জামাই আদরে অস্ট্রেলিয়ায় হাইকমিশনার রেখেছে তিন বছর ধরে এই সরকার। এখন শোনা যাচ্ছে, তাকে ফিরিয়ে এনে সেনাবাহিনী প্রধান করা হবে। প্রধানমন্ত্রী অস্ট্রেলিয়া সফরে গেলে এই আর্সেনিক প্রয়োগকারী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অপরিসীম তৃপ্তিতে সে অভ্যর্থনা গ্রহণ করেছেন।

 

ভারতের বরাক নদের ওপরে টিপাইমুখে যদি তারা বাঁধ দেয়, পানি প্রত্যাহার করে, তাহলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশাল এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হবে। এবং তিন কোটি লোক হবে পরিবেশ উদ্বাস্তু। মন্ত্রিসভার সদস্যরা বলতে থাকলেন- ভারত বলেছে, টিপাইমুখ বাঁধ দিলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। অতএব ক্ষতি হবে না। এমনকি এক মন্ত্রী তো বলেই বসলেন, ভারত টিপাইমুখে বাঁধ দেবে কি না দেবে সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এ বিষয়ে বাংলাদেশের কিছু বলার নেই। আগে বাঁধ দিক তারপর দেখা যাক, বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে কি হয়নি। এরপর প্রতিবাদের প্রশ্ন। এরাই এখন বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। এবং কে জানে কোন অদৃশ্য কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্যার তাদের পৃষ্ঠপোষক।

 

এ দিকে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। অভিযোগ, কয়েক হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন। পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, পাতাল সেতু- এসব হাবিজাবি নিয়ে স্বপ্ন-কল্পনার তিনি যে ফুলঝুরি ছড়ান, প্রধানমন্ত্রী তাকে সোল্লাসে স্বীকৃতি দেন। পদ্মা সেতুর অর্থায়নের কথা ছিল বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার। তারা আবুল হোসেনের দুর্নীতির অনেক তথ্য নিয়ে সরকারকে বলেছে, এ আবুল হোসেন দুর্নীতিবাজ। একে না সরালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থ দেয়া হবে না। বিশ্বব্যাংকের কাছে তার দুর্নীতির বিস্তারিত প্রমাণ আছে বলে তারা উল্লেখ করল। কিন্তু হঠাৎ চারদলীয় জোটের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদকারী সরকার একেবারে আবুল হোসেনের পক্ষ নিয়ে বসল।

 

আবুল হোসেন সাধারণ মানুষ নন। তিনি ব্যবসায়ী। হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাবে চলেন। পদ্মা সেতু থেকে মাত্র কিছু কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। বিশ্বব্যাংক বলল, তার এই হাতিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টার প্রমাণ তাদের কাছে আছে। প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন, বিশ্বব্যাংক কে? তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে তারা পদ্মা সেতু নির্মাণ করবেন। সে-ও এক বিরাট ধোঁকা। জয় তু আবুল হোসেন।

প্রধানমন্ত্রী এখন যখন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন, তখন সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন করা যায় যে, তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপি নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ করল, তাকে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি বলে অভিহিত করছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণসহ যত দুর্নীতির অভিযোগ করেছিল, সেগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এতে কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো?

 

রাষ্ট্র এখন রাষ্ট্রতে নেই। আমরা কার্যত ভারতীয় উপনিবেশে পরিণত হয়েছি। বাংলাদেশের বন্দর ভারতের। বাংলাদেশের সড়ক ভারতের। বাংলাদেশের রাস্তাঘাট ভারতের। বাংলাদেশের নদনদীর অস্তিত্ব ভারতের খেয়ালখুশির অধীন। বাংলাদেশ শুকিয়ে মরবে কি না ভারতের খেয়ালখুশির অধীন। ভারতীয় ট্রানজিট-করিডোরের যান চলাচলে বাংলাদেশের সড়কের যে ক্ষতি হবে, সেগুলো মেরামত করে দেবে বাংলাদেশের জনগণ। ভারত আমাদের বিছানো লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে চলে যাবে, আমরা করতালি দিয়ে হর্ষধ্বনি করব। এর নাম রাষ্ট্র?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য কলকাতা গিয়েছিলেন। কোথায় নামিয়ে আনা হলো বাংলাদেশকে? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলবে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে। ভারত জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার সাথে ফয়সালা করেন। এ দায়িত্ব মনমোহন সিংয়ের। বাংলাদেশের নয়। তিস্তার পানি আমাদের অধিকার। এটি ভারতের দয়া নয়। সরকার এভাবে বাংলাদেশকে ভারতের প্রদেশের মর্যাদায় নামিয়ে নিয়ে গেছে।

 

তাহলে উপায়? বর্তমান সরকারের এসব পদক্ষেপের কোনোটাতেই যে জনগণের সায় নেই সেটি উপলব্ধি করার ক্ষমতাও সরকার হারিয়ে ফেলেছে। কোনো স্বৈরশাসকই এটা কখনো উপলব্ধি করে না। কিন্তু এর পরিণতি কখনো শুভ হয় না। বর্তমান সরকারও যে তা উপলব্ধি করতে পারছে না, সেটা এখন আর অস্পষ্ট নেই। দেখা যাক, কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।

 

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক