ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৩৮:২১
বার্তা »
  

শান্তি, সমৃদ্ধি ও জাতীয় উন্নয়নে আলেমদের ভূমিকা


 

প্রাক কথন

যুগ পরম্পরায় বাংলাদেশের আলেম সমাজ স্ব স্ব অবস্থান থেকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও জাতীয় উন্নয়নে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের চরিত্র, সততা, নিষ্ঠা, কর্ম প্রয়াস, দেশপ্রেম, সময়ানুবর্তিতা প্রশ্নাতীত। শিক্ষার বিকাশ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্বও সহিষ্ণুতার চর্চা, চরিত্র গঠন ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা উত্তর ৪০ বছর এবং তৎপূর্ববর্তী ১০০ বছরের মধ্যে মূলধারার আলেমগণ দেশদ্রোহিতা, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বোমা হামলা, সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ডের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ নেই। ব্যক্তি বিশেষ যদি কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাকেও সেটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং তার জন্য পুরো আলেম সমাজ বা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা দায়ী নয়।

 

শিক্ষা, ব্যবসা, প্রশাসন ও ধর্মীয় কর্মকান্ডে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, সংখ্যার অনুপাত যত কম হোক না কেন? ক্রমান্বয়ে অনুপাত বৃদ্ধি করা গেলে শান্তি, স্বস্তি ও জাতীয় উন্নয়ন তরান্বিত হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। এর কারণ আছে। মাদ্রাসায় শিক্ষিতদের মধ্যে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা ও চর্চার ফলে পরকালীন জবাবদিহিতা সৃষ্টি হয়। পরকালীন জবাবদিহিতা ইহজাগতিক বিষয়াবলিকে সুশৃঙ্খল ও পরিশীলিত করে। কাজেই কোন আলেম ব্যক্তি, সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সীমা লঙ্ঘন করতে পারেন না। আলেমদের মূল কাজ হচ্ছে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে মানুষকে আহবান; অন্যায় ও গর্হিত কাজকে বাধা ও সত্য ও মঙ্গলের আদেশ প্রদান। তাই তাঁরা যে যেখানে যে অবস্থানে থাকুন না কেন এ দায়িত্ব থেকে সাধারণত বিচ্যুত হন না। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অখন্ডতার চেতনাকে দৃঢ়ভাবে লালনের মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষাই সত্যিকারের মানুষ গড়ে তোলার আদর্শ শিক্ষাঙ্গন। মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের দেশপ্রেম, কর্তব্যবোধ, পরোপকার, সামাজিক দায়িত্ব পালন, ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়া হয়। নৈতিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে সুনাগরিক উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে কাওমী মাদ্রাসাগুলোর রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা।

 

কওমী মাদ্রাসার স্বরূপ

১৮৬৬ সালের ২১ মে (১২৮৩ হি.) ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ শহরে আল্লামা কাছেম নানুতুভী রহ. ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে `দারুল উলুম\' নামক যে শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন, এটাই গোটা দুনিয়ায় কওমী মাদরাসার সূতিকাগার হিসেবে স্বীকৃত। বৈরী পরিবেশে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিশুদ্ধ আকীদা, তাহযিব-তামাদ্দুনের বিকাশে দারুল উলূম দেওবন্দের অবদান ঐতিহাসিক। সুপ্রাচীন কাল থেকে ধর্মপ্রাণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা, উদ্যোগ ও অর্থায়নে কওমী মাদরাসা সমূহ স্বতন্ত্র শিক্ষাধারায় দ্বীন ইসলামের মশাল প্রজ্জলিত রেখেছে। শতবছর ধরে হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা এতদঞ্চলে পবিত্র কুরআন ও হাদীস শিক্ষাদানের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক, চরিত্রবান, যোগ্য ও আদর্শবান জনগোষ্ঠী তৈরীর মহৎ কাজ আঞ্জাম দিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে কওমী মাদ্রাসার সফলতা বলতে গেলে ঈর্ষণীয়। কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকগণ মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ধর্ম প্রচার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সমাজসেবা ও নৈতিক আবহ সৃষ্টিতে কওমী মাদ্রাসার অবদান সর্বজন স্বীকৃত। সন্ত্রাস, বোমা ও জঙ্গি প্রশিক্ষণের সাথে এসব মাদ্রাসার দূরতম সম্পর্কও নেই। এসব মাদ্রাসার পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত-সুনিবিড়, নৈতিকতানির্ভর ও রাজনীতিমুক্ত। `দরসে নিযামী\' পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে দেড় শ\'বছর ধরে পুরো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ব্রিটেন, আফ্রিকা, মায়ানমার, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি সফল ইসলামী শিক্ষা ধারার বাহক হচ্ছে কওমী মাদ্রাসা। কাওমী মাদ্রাসার পরিচালক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ পবিত্র কুরআন, হাদীস, ফিক্হ, ভাষা-সাহিত্য, ক্লাসিক্যাল দর্শনের শিক্ষা ও খিদমত সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়ে আসছেন শত বছর ধরে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. এমাজ উদ্দীন আহমদ জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে যে মন্তব্য করেন তা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: মাদরাসা শিক্ষার একটা গৌরবজনক অধ্যায় রয়েছে। উপমহাদেশে যখন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তখন মক্তব মাদ্রাসা নামে পরিচিত ছিল। ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে কমিশনের পর আমরা জানতে পেরেছি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এসব শব্দগুলো। মাদরাসায় লেখাপড়ার মান উন্নত ছিল। কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক পড়ানো হতো। মাদরাসা থেকে বেরিয়েছেন এ উপমহাদেশের বহু জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি। তাঁরা রাজনীতির ক্ষেত্রে, সমাজ সেবার ক্ষেত্রে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অথবা কবি সাহিত্যিক হিসেবে স্বনামধন্য। তাঁদের নাম বলে শেষ করা যাবে না। দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কওমী মাদরাসার প্রচলন হয়। এ মাদরাসার ছাত্রদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে গড়ে তোলার ঐতিহ্য রয়েছে। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম অথবা বিভিন্ন পর্যায়ে জনস্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে কওমী মাদরাসার বড় ভূমিকা ছিল। দেশের একটি বিশাল শিক্ষার্থীর অংশ এখনো কওমী মাদরাসা হতে আলো পায় (নয়া দিগন্ত, ঢাকা, ২৩.১০.২০০৯)।

 

কওমী মাদ্রাসা তার জন্মলগ্ন থেকে দলীয় রাজনীতি হতে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে জনগণের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয়ে আসছে। কওমী মাদ্রাসা মূলত জনগণেরই প্রতিষ্ঠান। জনগণ আতংকিত হয় অথবা জনমত বিভ্রান্ত হয় এমন কাজ সঙ্গতভাবে মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকগণ করতে পারেন না। এসব মাদ্রাসায় ছাত্র রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দলীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে বহিস্কার করার নীতি প্রায় সব কওমী মাদ্রাসায় কঠোরভাবে বলবৎ রয়েছে বিধিবদ্ধভাবে। ছাত্রনং অধ্যয়নং তপ\' সংস্কৃত এ শ্লোকের বাস্তব প্রমাণ মেলে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাধারা ও শিক্ষার্থীদের মাঝে। এহেন মিথ্যাচারের কারণে সন্ত্রাস ও বোমা বিস্ফোরণের সাথে জড়িত দুস্কৃতকারীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে এবং আসল অপরাধী ও তাদের গড ফাদারগণ পার পেয়ে যাবে।

 

কওমী মাদ্রাসা তো এ দেশের বাস্তবতা। বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় ছড়িয়ে আছে শত শত কওমী মাদ্রাসা। বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন এন্ড স্ট্যাটিসটিক্স কর্তৃক ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫,২৩০ টি কওমী মাদ্রাসা রয়েছে এবং তাদের ছাত্র সংখ্যা ১৪ লাখ। জনগণ ও কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য তৃতীয় একটি শক্তি সক্রিয়। তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে অভ্যস্ত।

 

সুগভীর চক্রান্ত

এ দেশের ঐতিহ্যবাহী কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বিষোদগারের এক সুগভীর চক্রান্ত নতুনভাবে শুরু হয়েছে। এ চক্রান্তের নেটওয়ার্ক সুবিস্তৃত ও অত্যন্ত সুসংগঠিত। আন্তর্জাতিক ইহুদিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি হচ্ছে এ চক্রান্তের মূল। তাদের বৃত্তিভোগী এজেন্টরা সুকৌশলে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছে। এসব এজেন্টগণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও পদে অধিষ্ঠিত থেকে এক ভাষায় কথা বলছেন এবং একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন নানা অজুহাত খাড়া করে। এন.জি.ও সমর্থিত বেশ ক’টি সংবাদপত্র তিলকে তাল করে এবং তালগোল পাকিয়ে তথ্য সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে, যাতে জনমত বিভ্রান্ত হয়।

 

বাংলাদেশের আলেম-ওলামা ও কওমী মাদ্রাসা নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকাও টিভি চ্যানেলে গোয়েবলসীয় কায়দায় জঘন্য মিথ্যা প্রচারণা শুরু হয়েছে। দাড়ি-টুপি ওয়ালাদের পাইকারী হারে টার্গেট করা হচ্ছে। কওমী মাদ্রাসাকে বলা হচ্ছে জঙ্গিদের নিরাপদ আস্তানা; জঙ্গি তৈরীর উর্বর ক্ষেত্র। দেশের ভিতরে-বাইরে একশ্রেণীর সংবাদপত্রের সহায়তায় একটি মহল বাংলাদেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণ করার প্রয়াস চালাচ্ছে। ইসলামী এন, জি, ও দের চিহ্নিত করা হচ্ছে সন্ত্রাসী লালনে টাকার যোগানদাতা হিসেবে। এসব পত্রিকায় সময়ে সময়ে আলেম ওলামাদের ব্যঙ্গ চিত্রসহ কাল্পনিক ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় অনেকটা আতঙ্ক সৃষ্টি করে পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য। এভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে পীর-মাশায়েখদেরকে এবং আহত করা হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধকে।

 

একথা স্পষ্ট ভাষায় এবং জোর তাগিদের সাথে বলা যায় যে, এ দেশে সন্ত্রাস ও বোমা হামলায় বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসার কোন ছাত্র-শিক্ষক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জড়িত নয়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কোন কওমী মাদ্রাসায় কোন সময় সামরিক ট্রেনিং প্রদানের ব্যবস্থা ছিল না এবং এখনো নেই। এমনকি বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বি,এন,সি,সি (Bangladesh National Cadet Corp) এর অধীনে যে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তারও কোন ব্যবস্থা কওমী মাদ্রাসায় নেই।

 

ইসলামে সন্ত্রাসের স্থান নেই

ইসলামী আইনে সন্ত্রাস নিষিদ্ধ। ইসলাম ও মুসলিমের সাথে সন্ত্রাসকে সম্পর্কিত করার যে অপচেষ্টা চলছে তা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। এ অপপ্রয়াসের লক্ষ্য ইসলামের বিশ্বব্যাপী ভূমিকার ওপর আঘাত হানা। ইসলামের সন্ত্রাসের কোনও ঠাঁই নেই, মুসলমানরা কোন সন্ত্রাস করতে পারে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা। তাই এর অনুসারীরা বিশেষত আলেমগণ মানুষ হত্যা করতে পারেন না। কেননা, নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে পবিত্র কুরআনে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার শামিল বলে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই কোনও মুসলমান নিছক রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে মানুষতো দূরের কথা অন্য কোনও প্রাণীও হত্যা করতে পারে না। সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে কখনও কখনও দু\'একটি মুসলিম নামধারী গ্রুপ নিজেদের ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করে। কিন্তু আসলেই কি তারা মুসলিম? নাকি মুসলমানের ছদ্মবেশে অন্য কেউ? তারা তো এমনও হতে পারে যে, কোনও পক্ষের হয়ে কাজ করার জন্য তাদের তৈরি করা হয়েছে। বিশেষত ইসলাম এবং মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসের দায়ভার চাপিয়ে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা নিজেদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছে কিংবা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াবার কাজটি কৌশলে চালিয়ে তার লক্ষ্য হাসিল করতে চাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত লোনওয়াচডটকমের রিপোর্ট দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে জান-মালের যে ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে তার জন্য ইসলাম বা এর অনুসারীরা দায়ী নয়। দায়ী অন্য কেউ, অন্য কোনও পক্ষ।

 

আগামীদিনের বিশ্ব নিশ্চয়ই প্রকৃত সন্ত্রাসীদের চিনতে সক্ষম হবে। পৃথিবীর কোনও দেশে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই মুসলমানদের ওপর তার দায়ভার চাপিয়ে দেবার প্রবণতা আমরা কয়েক দশক ধরে লক্ষ্য করছি। অথচ এফবিআই এবং ইউরোপোলের গবেষণাধর্মী রিপোর্ট থেকে সম্প্রতি ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলেছে তার সিংহভাগই চালিয়েছে অমুসলিমরা। লোনওয়াচডটকম’ নামের ওয়েব সাইটের তথ্যানুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দশমিক ৪ শতাংশ ঘটেছে মুসলিমদের দ্বারা। বাকি ৯৯.৬ ভাগ সংঘটিত করেছে অমুসলিম বা অন্যধর্মের অনুসারীরা। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় যত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটেছে তার ৬ শতাংশ মুসলিম নামধারীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। বাকি ৪২% ল্যাটিন, ২৪% বামমনা, ৭% ইহুদি চরমপন্থি, ৫% সমাজতন্ত্রী ও ১৬% ঘটেছে অন্য গ্রুপগুলোর দ্বারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, এশিযার বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপ আমেরিকাতে কোনও সন্ত্রাসী, ঘটনা ঘটলেই ঢালাওভাবে বাছবিচার না করেই মুসলমানদের ওপর তার দায় চাপিয়ে দেয়া হয়। বিশেষ করে এক শ্রেণীর মিডিয়া সন্ত্রাসের দায়দায়িত্ব মুসলিম সংগঠনসমূহের ওপর চাপিয়ে যেন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বগল বাজাতে শুরু করে’ (দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা)।

 

বরেণ্য সাহিত্যিক ও গবেষক হাসানাত আবদুল হাই-এর মতে সন্ত্রাসের উৎপত্তি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নয়। উনবিংশ শতাব্দিতে ইউরোপে এনার্কিস্ট বলে যারা পরিচিত ছিল তারাই সন্ত্রাসের পথিকৃৎ একথা বলা যায়। এনার্কিস্ট যে এজেন্ডা ছিল তা রাজনৈতিক। তারা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ মানতে চায়নি। নিজেদের নিয়ম কানুন অনুযায়ী স্বশাসিত গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে বাস করতে চেয়েছে। তারা রাষ্ট্রকে মনে করেছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শত্রু । তাদের আক্রমণের টার্গেট তাই ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতীক। বিচারালয়, ব্যাংক, মন্ত্রণালয়, বিধান সভা ইত্যাদি (হাসানাত আবদুল হাই, আত-তাওহীদ, চট্টগ্রাম)।

 

এ দেশের মানুষ ভালভাবে জানেন যে, মাদ্রাসায় চরিত্রবান ও আদর্শ ছাত্র তৈরী হয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার সাথে দীক্ষার (তারবিয়ত) ব্যবস্থা আছে, যা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। মাদ্রাসায় ছাত্র রাজনীতি বন্ধ থাকায় কোন সংসদ নেই। ফলে সংগত কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে হানাহানিও নেই। সন্ত্রাসের কারণে এদেশের কোন মাদ্রাসা একদিনের জন্য বন্ধ হয়নি। অথচ এদেশের হাতেগোনা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কমবেশী সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় মিনি ক্যান্টনমেন্টে রূপান্তরিত হয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট সৃষ্টি এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাজারো টগবগে মেধাবী তরুণ নৃশংসভাবে প্রাণ হারিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ধর্ষণ জাতির কপালে কলংকের তিলক রেখা অংকিত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে যেভাবে অস্ত্রের মহড়া চললো এবং প্রাণহানি ঘটলো তাতে পুরো জাতি উদ্বিগ্ন। এতদসত্ত্বেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের কোন দাবী উঠেনি। সাজানো কিছু নাটক, পাতানো খেলা ও কল্পিত তথ্যকে ভিত্তি করে মাদ্রাসা বন্ধের দাবী তোলা রীতিমত হাস্যকর ও উদ্ভট।

 

গত ২০০৯ সালের মার্চ মাসের ৩১ তারিখে বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর Xian Zhu বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের নিকট প্রেরিত এক প্রতিবেদনে যে মন্তব্য করেন তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এ প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয় এতে বলা হয় বাংলাদেশে কাওমী মাদ্রাসা সমাজ কর্তৃক পরিচালিত এবং তাদের ভূমিকা গঠনমূলক ও সময়োপযোগী। বিদ্যমান কাওমী মাদ্রাসা গুলোর মোট ব্যয়ের ৫৭ ভাগ সমাজের সদস্যগণ ব্যক্তিগত অথবা সমষ্টিগতভাবে বহন করে থাকেন। সরকারী কোন সাহায্য ছাড়াই এসব মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নতি সাধিত হয়েছে এবং সিলেবাসে আধুনিক বিষয়াদি সংযোজিত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মাদ্রাসার ছাত্রদের অন্তর্ভূক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ অভিযোগটিরও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে মহিলাদের মাদ্রাসায় অধ্যয়নের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ নিচে উদ্ধৃত করা গেল-

 

“Private donations account for 57 per cent of the money spent on running Qoumi Madrassah which confirms the popular beliefs that these types of institutions survive under community patronage and donations from Muslim households and individuals. If the parents only care about whether their child excels in religious studies, then as we point out in the report, Qoumis are doing a good job. Unlike traditional Madrassahs in Pakistan, traditional Madrassahs in Bangladesh seems to have undergone structural changes even in the absence of any state intervention. Some have started to admit girls in recent years in addition to undertaking some modernization of the curriculum it reads. Increase of Madrassah graduates in Bangladesh Army is unfounded. Qoumi Madrassahs in Bangladesh are also becoming increasingly feminized.” (আমার দেশ, আত-তাওহীদ)।

 

কওমী মাদ্রাসা ঐতিহ্যসমৃদ্ধ একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত শিক্ষাধারা। কওমী মাদ্রাসা মূলত পরিচালিত হয় জনগণের সহায়তা, পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়নে। ঐতিহাসিক দরসে নিযামীর শিক্ষাধারায় পুষ্ট এসব মাদরাসার রয়েছে মযবুত গণভিত্তি। কওমী মাদ্রাসার উপর অবাঞ্চিত হাত পড়লে জনগণ ঘুরে দাঁড়াবে। এ দেশের কোন নাগরিক যদি তার সন্তানকে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত করাতে চায় তাকে তো সে অধিকার দিতে হবে। এ অধিকার জোর করে কেড়ে নেয়া মানবাধিকার হরণ করার নামান্তর। এ কারণেই তো কওমী মাদ্রাসার প্রয়োজন। কওমী মাদ্রাসার আদর্শ ও ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে ইতিবাচক যে কোন পদক্ষেপকে সহযোগিতা করতে উলামা-মাশায়েখগণ প্রস্তুত রয়েছেন।

 

মাতৃভাষার অনুশীলন ও চর্চা

স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাসমূহে বাংলা ভাষার অনুশীলন ও চর্চা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশ কিছু মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করার পর আগ্রহী ছাত্রদের জন্য এক বছর বা দুবছর ব্যাপী বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ইসলামী গবেষণা বিভাগ খোলা হয়েছে অনেক আগে থেকে। বহু কওমী মাদ্রাসায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইংরেজী, গণিত, সমাজ ও বাংলা ভাষার চর্চা হয়। পরিবর্তিত এ দৃষ্টিভঙ্গি মাতৃভাষাসহ আধুনিক বিষয়ের প্রতি আলেমদের গভীর মমত্ববোধের পরিচয় বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে নিম্ন পর্যায় থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা চর্চার প্রচলন শুরু হয়েছে।

 

বাংলাভাষী দেওবন্দী বহু আলেম বিগত ৬ দশক ধরে বাংলার চর্চা, অনুশীলন ও প্রচলনের জন্য ব্যাপক মেহনত করে আসছেন। এক্ষেত্রে হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ., পটিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা কুতবে যামান হযরত মুফতী আযিযুল হক রহ., হযরত মাওলানা আলহাজ্ব মুহাম্মদ ইউনুছ রহ., খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক রহ., শায়খুল হাদীস মাওলানা আযিযুল হক, মাওলানা নুর মোহাম্মদ আযমী রহ., মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, মাওলানা আমিনুল ইসলাম রহ., মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ., মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী রহ.ও মাওলানা সালমান (দারুর রাশাদ) ও মুফতী মাওলানা আবদুল মালেক এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় তাঁদের অবদান জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। এ প্রজন্মের বহু আলেম বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার চর্চায় এগিয়ে এসেছেন-যা কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে রীতিমত আশার সঞ্চার করে। বাংলাদেশের বড় বড় মাদ্রাসা থেকে যে সব নিয়মিত বাংলা মাসিক জার্নাল বের হয়; বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা ও ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমে রয়েছে তাদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা।

 

সুপারিশ

জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষত চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসায় প্রশাসন, কলা, সমাজবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনীতি বিজ্ঞান, গণযোগাযোগ, সাংবাদিকতা, তথ্য-প্রযুক্তি, কম্পিউটার সায়েন্স, আইন প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা ও ডিগ্রী অর্জনের জন্য পরিকল্পিতভাবে মাদ্রাসা ছাত্রদের একাংশকে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করার পর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করা দরকার বলে আমি মনে করি। ডিগ্রী অর্জনের পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিশেষত শিক্ষক নিবন্ধন, বিমান, নৌ, ও সেনা বাহিনীর কমিশন র‌্যাংক ও বি.সি.এস এ অংশ নিয়ে প্রতিরক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড পরিচালনায় অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কম বেশী সব শাখায় ওলামাদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ উন্মুক্ত হবে। সময়ের ব্যবধানে তৈরী হবে এক ঝাঁক বিশেষজ্ঞ আলেম (Specialized Ulama)। এ পথে আলেমগণ সমাজের সার্বিক কল্যাণ ও জাতীয় সমৃদ্ধিতে আত্মনিয়োগের সুযোগ লাভ করবেন। সমাজ ব্যবস্থায় আসবে নতুন চমক। নতুন সহস্রাব্দের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এটাই তাঁদের অন্যতম হাতিয়ার।

 

স্মর্তব্য, কাওমী মাদ্রাসার ফারেগীনদের মধ্যে একটি বিরাট অংশকে ইল্মে দীনের খিদমতে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। উলূমুল কুরআন, উলূমুল হাদীস, উলূমুত তাফসীর, উলূমুল ফুনূন, উলূমুল লোগাত ওয়াল আদব, উলূমুল আরুয ওয়াল বালাগত, উলূমুন নাহভ ওয়াস সারাফ, মাকারানাতুল আদিয়ান (Comparative Study of Religion) বিষয়ে দেশী-বিদেশী ডিগ্রী নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্কলার হতে হবে, তাহলে তাঁদের খিদমদের পরিধি হবে ব্যাপক বিস্তৃত। আলেমগণ ইলমে দীনের প্রচারক, ধারক ও বাহক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আলেমগণ নিঃস্বার্থতার সাথে কুরআন, হাদীস ও ইলমে ফিকহের বিকাশে এবং ওয়ায-নসীহতের মাধ্যমে ইসলামী আবহ ও মূল্যবোধ সৃষ্ঠিতে গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখে চলেছেন। ইতিহাস তার সাক্ষী। এ পথে তাঁদের ব্যাপক সাধনা ও গবেষণা অপরিহার্য। মাদ্রাসার সব ছাত্র ফারিগ হওয়ার পর আধুনিক শিক্ষার প্রতি ধাবিত হলে এবং দুনিয়াবী কর্মকান্ডে লিপ্ত হলে ইলমে দীন চর্চার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়বে। তবে আধুনিক শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী নিয়ে ইলমে দীনের খিদমতে জীবন উৎসর্গ করতে পারেন; এ রকম দৃষ্টান্ত পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে আছে। ড. মাওলানা আবদুল্লাহ আব্বাস নাদভী নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় হতে ভাষাতত্ত্বে এম.এ; পি.এইচ.ডি ডিগ্রী নিয়েও মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় ও দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার উস্তাদ ও শিক্ষা পরিচালক হিসেবে আমৃত্যু খিদমতে নিয়োজিত ছিলেন। এখনও নাদওয়াতে এম.এ; পি.এইচ.ডি ডিগ্রীধারী অনেক শিক্ষক রয়েছেন। মুফতী তাকী উসমানী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ও করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ক উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েও এখন পর্যন্ত দারুল উলূমের প্রধান মুহাদ্দিস হিসেবে কর্মরত আছেন। ইলমে নববীর পাশাপাশি আধুনিক ডিগ্রী তাঁকে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করে। ভারতের দেওবন্দ ও সাহারানপূরের বহু ফারেগীন পরবর্তীতে উচ্চতর আধুনিক ডিগ্রী নিয়ে আলীগড়, লক্ষ্মৌ, দিল্লী, ক্যালিকট, পাটনা, রাঁচী, জওয়াহের লাল নেহেরূ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন এবং এখনো করছেন। ঢাকার মিরপুরের দারুর রাশাদের একাধিক মুহাদ্দিস মাস্টার্স ডিগ্রীধারী এবং জাতীয় দৈনিকের সাথে বিযুক্ত। সাম্প্রতিককালে ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসার উস্তাদ ও মসজিদের খতীবদের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ধর্মীয় প্রোগ্রাম পরিচালনা করতে দেখা যায়। এটা আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে।

 

প্রয়োজন প্রতিনিধিত্বশীল অরাজনৈতিক সংগঠন

বর্তমানে কওমী মাদ্রাসার ওপর যে সব বহুমূখী হামলা হচ্ছে তার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন গোটা দেশ জুড়ে প্রতিনিধিত্বশীল কওমী মাদ্রাসার একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। যে প্লাটফরমের মাধ্যমে নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সংলাপ, কর্মশালা করে নিজেদের অবস্থান জনসমক্ষে তুলে ধরা যেতে পারে। আধুনিক শিক্ষিত ও সাধারণ জনগণকে এ সংগঠনের মাধ্যমে অথবা ব্যক্তিগত যোগাযোগ দ্বারা কওমী মাদ্রাসার প্রতি সংবেদনশীল করে গড়ে তোলা যাবে। সুচিন্তিত পন্থায় সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করা গেলে মাদ্রাসার প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন স্বার্থান্বেষী মহল রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হবে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সাথে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের কোন প্রকার যোগাযোগ নেই বললে চলে। সাংবাদিকদের মধ্যে বহু দীন দরদী ব্যক্তি আছেন যারা আলেম উলামা ও মাদ্রাসাকে মুহাব্বত করেন; কিন্তু যোগাযোগের অভাবে গ্যাপ তৈরী হয়েছে। এ গ্যাপ যত তাড়াতাড়ি দূরীভূত করা সম্ভব হবে ততই মঙ্গল। মিডিয়া হাতে থাকলে আগ্রাসীদের অপতৎপরতা রুখে দেয়া কোন ব্যাপার নয়।

 

শেষ কথা

বাংলাদেশের বিগত ৪০ বছরের ইতিহাসে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ সমাজ, রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী কর্মকান্ডে বা সন্ত্রাসী তৎপরতার সাথে জড়িত থাকার কোন প্রমাণ নেই। কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার সুদীর্ঘ ইতিহাসে খুন-খারাবী, টেন্ডার বা চাঁদাবাজি, আপহরণ ও বোমা হামলার ন্যুনতম কোন নজির নেই। মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে এখানে বিরাজ করে রাজনীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত সুষ্ঠু শিক্ষার মনোরম পরিবেশ। সুতরাং মাদ্রাসায় অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পরিকল্পনার প্রশ্নই অবান্তর। আর সন্ত্রাসের আওতায় পড়ে এমন ঘটনা কোথাও ঘটলে তা নিশ্চিতভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দায়ী। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ যদি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মত অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে এবং অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহারের চেষ্টা চালায়, সে দায় কোন মাদ্রাসা নিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে বা সব মাদ্রাসাকে ঢালাওভাবে দায়ী করা যুক্তি সংগত নয়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ অবদমনে প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে সহযোগিতা করতে এ দেশের ওলামা-মাশায়েখগণ সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত।

 

লেখক: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,

ওমর গণি এম.ই.এস পোষ্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, চট্টগ্রাম;