ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৩৩:৪৪
বার্তা »
  

মিসর পরিস্থিতি একটি মূল্যায়ন


 

২৫ জানুয়ারি ২০১১ মিসরে একটি গণবিপ্লবের মাধ্যমে মোবারক সরকারের পতন হয়। এই গণবিপ্লবে জনগণের সব অংশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশও সহযোগিতা করে। সেনাবাহিনী দেখল যে, সাধারণ জনগণের রক্তপাত ও গণহত্যা কখনও কাম্য নয়। তাই তারা প্রেসিডেন্ট মোবারকের পক্ষ ত্যাগ করে জনগণের বিজয় অর্জনে সহায়তা করল।

 

কিন্তু সেনাবাহিনী যে ভুলটা করল তা হচ্ছে বিগত ১০ মাস তারা ক্ষমতায় আছে। অথচ এ সময়ে গণতন্ত্রের জন্য তারা তেমন কিছু করতে পারল না। সামরিক আদালতে সাধারণ জনগণের বিচার অব্যাহত থাকল। এরপর গত মাসে তারা আরও একটি ভুল করে, তা হচ্ছে Selmui Initiative বা সেলমি উদ্যোগ। সেলমি হচ্ছেন যে সরকার পদত্যাগ করেছে তার একজন মন্ত্রী। এ উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে ছিল সামরিক সরকারের উদ্যোগ। তাতে ভবিষ্যতের সংবিধানে সামরিক বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেয়ার কথা ছিল। সব দল এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মুসলিম ব্রাদারহুড এ ধারণা ত্যাগ না করলে আবার তাহরির স্কোয়ারে জমায়েত হওয়ার হুমকি দেয়। কয়েক দিন আগে জনগণের একটি অংশ তাহরির স্কোয়ারে সমবেত হয়। সেখানে সরকারের একটি অংশ তাদের আক্রমণ করে। এর ফলে ৪০ জনের মতো লোক নিহত হয়। ফলে আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সামরিক প্রধান মার্শাল তানতাভি এবং আরও কিছু জেনারেল টেলিভিশনের মাধ্যমে জনগণের কাছে ক্ষমা চায়। তারা আগের সরকারের পদত্যাগ গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (Freedom & Justice Party) (ইখওয়ানুল মুসলিমিনের রাজনৈতিক শাখা) বিবৃতি দেয় যে, তাহরির স্কোয়ার খোলা থাকতে হবে এবং ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর করতে হবে জনগণের প্রতিনিধির কাছে।

 

জেনারেল তানতাভি জনসম্মুখে বললেন যে, তারা এপ্রিলের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে ফেলবেন এবং পরে আরও ২ জন সেনাবাহিনীর জেনারেলও জাতির কাছে ঘোষণা দিলেন তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো ইচ্ছা নেই।

 

এদিকে ইখওয়ানুল মুসলিমিন নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া সমর্থন করেনি। তারা নির্বাচনই গণতন্ত্রে ফিরার পথ বলে জানায়। তারা দেখল যে, যুবক শ্রেণী এবারের আন্দোলনে খুব একটা অর্গানাইজড নয়। ফলে ইখওয়ান তাহরির স্কোয়ারে গেল না। ফলে যেখানে দশ লাখ লোকের সমাবেশ হতে পারত সেখানে মাত্র ১ লাখ লোকের জমায়েত হলো। এ ব্যাপারে ইখওয়ানের সভাপতি ড. বাদি তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাত্কার প্রদান করেন।

 

ইখওয়ান আরও বলল যে, তাদের ভুল বোঝা হচ্ছে। তাদের নামে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ফ্রিডম ও জাস্টিস পার্টির প্রধান ড. মরসি (Dr. Morsi) বললেন, নির্বাচন কোনোভাবে পেছানো যাবে না। এটা ২৮ তারিখেই হতে হবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। মিসরে এত কিছুর মধ্যেও নির্বাচন কমিশন নিয়ে কারও মধ্যে কোনো বিতর্ক নেই যে, তারা সার্বিকভাবে নির্বাচন করতে পারবে না। মিসরে নির্বাচন জুডিশিয়ারি পর্যবেক্ষণ করে। যখন আমি লিখছি (২৮ নভেম্বর ২০১১) তখন নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে হয় (FJP) সেখানে জিতে যাবে এবং তারা সংসদে সম্ভবত সর্ববৃহত্ দল হবে। তাদের জনসমর্থন ৪২ শতাংশের মধ্যে। FJP আগেই ঘোষণা করেছে যে, তারা প্রেসিডেন্ট পদে কোনো প্রার্থী দেবে না। যে পাঁচজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আছেন, যিনিই জয়লাভ করুন না কেন, তাকে তারা মেনে নেবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং পশ্চিমা অবিশ্বাস/অ্যালার্জির কারণে তারা একা ক্ষমতায় যেতে চায় না। কয়েক পর্বে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

 

মিসর একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। যে কোনো পক্ষ থেকে যে কোনো ধরনের হটকারিতায় মিসরের ক্ষতি হবে। মিসরের সামরিক সরকার রাজনৈতিক দলগুলো এবং যুবকদের উচিত হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।

 

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

[সূত্রঃ আমার দেশ, ৩০/১১/১১]