ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৩৩:৪১
বার্তা »
  

দিল্লির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নাই


 

টিপাইমুখ ড্যাম বানাবার জন্য গত ২২ অক্টোবর যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে ভারতে এবং দিল্লি তা বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এতে হঠাৎ বাংলাদেশে হাহাকার পড়ে গিয়েছে। যাঁরা শেখ হাসিনা ও মনমোহনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে বলে হাততালি দিয়ে আসছিলেন, তাঁরা পড়েছেন বিপদে। এর আগে বাংলাদেশের প্রতি দিল্লির ধ্বংসাত্মক নীতির যাঁরা সমালোচনা ও বিরোধিতা করে আসছিলেন তাঁদের এঁরা ভারতবিরোধী বলে প্রচার করে আসছেন এবং খানিক সফলও হয়েছেন। তাঁদের নসিহত হচ্ছে, দিল্লিবিরোধী হওয়া খুব খারাপ কাজ। আমাদের উচিত দিল্লির শাসকদের গালে সবসময় চুমু খাওয়া। তাঁরা যদি আমাদের এক গালে থাপ্পড় দেয় তাহলে আমাদের উচিত তাঁদের প্রতি দ্বিতীয় গাল এগিয়ে দেওয়া। তাঁরা দিল্লির শাসকদের বিরোধিতা করাকে ভারত-বিরোধিতার সমার্থক বলে সবসময় প্রচার করে।

 

ভারত আমাদের মিত্র, এই কথা বলে তাঁরা আসলে ভারতের জনগণ আমাদের মিত্র এটা বোঝান না, বরং এটাই বোঝাতে চান যে দিল্লিই আমাদের মিত্র। দিল্লিই আমাদের একাত্তরে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আমাদের উচিত দিল্লির শাসক ও শোষকদের গোলামি করা। তাঁরা দাবি করেছিলেন যদি আমরা দিল্লির কথামতো তাঁদের নিরাপত্তা ও সামরিক স্বার্থ মানি ও দিল্লির দাবি অনুযায়ী সন্ত্রাসীদের দিল্লির হাতে তুলে দিই তাহলে দিল্লি আমাদের কথাও শুনবে। দিল্লি যাদের চেয়েছে তাদের দিল্লির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের নামে করিডোর চুক্তি ও তা বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। কিন্তু কিছু পাওয়া দূরে থাক, তিস্তার পানি নিয়ে যে চুক্তি হবার কথা ছিল, সেটা হয় নি। বলা হয়েছে, মনমোহনের সফরের সময় মমতা আপত্তি জানিয়েছেন বলে হয় নি, তবে হবে। এখন মমতা ব্যানার্জি বলছেন তিস্তাতে পানিই তো নাই, বাংলাদেশকে দেবে কোত্থেকে? আসলে পানি পাওয়া যাবে না, এটাই হোল আসল সত্য কথা। এখন আবার দিল্লি যখন টিপাইমুখ ড্যাম বানানো শুরু করেছে, তখন ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদীর উজানে কোন অবকাঠামো বা প্রকল্প করা হলে তা বাংলাদেশকে জানাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দিল্লি, চুক্তিও নাকি হয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশকে কোন তথ্য বা খবরাখবর না দিয়ে দিল্লি এটা কী করছে!! কেন বাংলাদেশ সরকার প্রতিবাদ করছে না? যাঁরা বাংলাদেশে দিল্লির স্বার্থ রক্ষার জন্য সদা তৎপর থাকেন এখন দেখছি তাঁদের একটা হিজিবিজি লেজেগোবরে অবস্থা!

 

এটা ঠিক যে ভারতের গণতান্ত্রিক জনগণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে খাড়া করে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সামপ্রদায়িক রাজনীতি চর্চার একটা ধারা আছে। যদি অস্বীকার না করি তাহলে এটাও বুঝতে হবে বাংলাদেশে দিল্লির স্বার্থ-সংরক্ষক গোষ্ঠি ও শক্তি এতে দারুণ উপকৃত হয়েছে। তাঁরা অনায়াসেই দিল্লির বিরোধিতাকে ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে বিরোধিতা হিশাবে প্রচার করতে পেরেছেন। অথচ বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর জনগণও আমাদের মতো দিল্লির শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হবার জন্য লড়ছে দীর্ঘ দিন। লড়ছে কাশ্মিরের জনগণ। ভারতের নিপীড়িত জাতিসত্তার লড়াইয়ের পাশাপাশি লড়ছে নিম্নজাতের মানুষ ও মজলুম শ্রেণিগুলোও। বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য এই লড়াইয়ের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সত্যকে আড়াল করবার জন্য বাংলাদেশে সবসময়ই একটি গোষ্ঠি প্রচার করে- দিল্লির বিরোধিতা করা মানে ভারতের জনগণের বিরোধিতা করা। এখন দেখছি তারাও যেন দিল্লির বিরোধী হয়ে উঠছে।

 

কিছু বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার ২২ অক্টোবর ড্যাম নির্মাণের জন্য যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর সম্পর্কে যারা এই বলে আপত্তি জানাচ্ছেন যে, এ ধরনের চুক্তি করার আগে বাংলাদেশকে জানানোর প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি রয়েছে, তাঁরা ভুল বলছেন। বাংলাদেশের জনগণকে তাঁরা খামাখা বিভ্রান্ত করছেন। টিপাইমুখ প্রকল্প সম্পর্কে মৌখিক আশ্বাস ছাড়া ভারত টিপাইমুখের কাজ আরম্ভ করলে বাংলাদেশকে জানাবে বলে কোন প্রতিশ্রুতি দেয়নি বা চুক্তি করে নি। যাঁরা দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির ৯ নম্বর ধারা অনুসারে, একতরফাভাবে কোন যৌথ নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ নাই বলে দাবি করছেন, তাঁরাও ঠিক বলছেন না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১০ সালের ১০-১২ জানুয়ারি দিল্লি সফরের সময় যে ৫১ দফা সমঝোতা স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তার ৩১ দফায় শুধু এই আশ্বাস দেয়া হয়েছে যে দিল্লি এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এরপর ২০১১ সালের ৬-৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে এসে যে ৬৫ দফার যৌথ বিবৃতি স্বাক্ষর করেন, সেখানেও ২১ দফায় আশ্বাসের অতিরিক্ত কোন প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি নাই। কিন্তু এই ধরনের যৌথ ঘোষণা বা বিবৃতির অর্থ হচ্ছে দিল্লি টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সেটা জানিয়েই দিচ্ছে। শুধু এই আশ্বাস দিচ্ছে তারা এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। ক্ষতি হচ্ছে কি হবে না সেটা দুই দেশ যৌথ ভাবে নির্ণয় করবে তার কোন ইঙ্গিত বা ইশারা কোত্থাও নাই। সেটা দিল্লিই ঠিক করবে ক্ষতি হবে কি হবে না। কিন্তু যৌথ ঘোষণায় এই বিবৃতি থাকায় দিল্লি একতরফা টিপাইমুখ বাস্তবায়ন করছে সেই অভিযোগ এখন আর তোলা যাবে না। বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাবার জন্য যাঁরা দাবি করছেন সেই প্রতিবাদ জানাবার ভিত্তি এই ধরনের সমঝোতা ও যৌথ বিবৃতির মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার সরকার নষ্ট করে রেখেছে। এখন কোন্ মুখে প্রতিবাদ জানাবে? এই সব বলে চিৎকার করে যাঁরা জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন তাঁদের সম্পর্কে সাবধান করার জন্যই এই লেখা। এই ধরণের সমঝোতা ও বিবৃতির মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালের গঙ্গাচুক্তির অধীনে ভারতের দায়দায়িত্বের প্রসঙ্গ তোলার ন্যায্যতাও বাংলাদেশ হারিয়েছে।

 

টিপাইমুখ বা অন্য কোথাও অভিন্ন নদীতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের গঙ্গাচুক্তিকে দুই দেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক আইন বললেও বাংলাদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়। এই চুক্তিতে অনেক ভাল ভাল কথা থাকতে পারে। যেমন ৯ নং অনুচ্ছেদে ন্যায়পরায়ণতা (ইকুইটি), ন্যায্যতা (ফেয়ারনেস) এবং কারো ক্ষতি নয় (নো হার্ম)- ইত্যাদি। কিন্তু এই সব অর্থহীন এই কারণে যে চুক্তি যদি বলবৎযোগ্য না হয় তাহলে এগুলি নিছকই কাগুজে কথার অতিরিক্ত কোন মূল্য বহন করে না। চুক্তি বা আইন অসম ক্ষমতাকে একই কাতারে নামিয়ে আনা যায় না। ভারত বৃহৎ ও শক্তিশালী দেশ। নীতি, চুক্তি, আইন বা বিধিবিধানের কথা এই ক্ষেত্রে সেই সব বলবৎ করবার শক্তি বাংলাদেশের যেমন নাই, তেমনি এমন কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা শক্তিকেন্দ্র নাই যেখানে বাংলাদেশ নালিশ করে প্রতিকার পেতে পারে।

যাঁরা দাবি করছেন আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোন যৌথ পরিবেশে সমীক্ষা ছাড়া টিপাইমুখ বাঁধ ভারত নির্মাণ করতে পারে না, তাঁরাও ভুয়া কথা বলে সময় অপচয় করছেন। ভারত করলে ঠেকাতে পারছে কে? ঠিক যে আন্তর্জাতিক কিছু পরিবেশ চুক্তি রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই স্বাক্ষর করেছে। যেমন ১৯৯২ সালের বায়োডাইভারসিটি কনভেনশান, ১৯৭২ সালের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশান, ১৯৭১ সালের ওয়েটল্যান্ড কনভেনশান, ইত্যাদি। এই দলিল অনুসারে বাংলাদেশের নিজেরই অনেক আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করবার কথা। বাংলাদেশ নিজেই সেটা করে নি ও করে না। পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজের ভূমিকা ভয়াবহ। সেই ক্ষেত্রে ভারতকে যৌথ পরিবেশ সমীক্ষা করতে রাজি করানোর কথা বলা হাস্যকর। এই চুক্তিগুলো বলবৎ বা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নাই। যা চুক্তি বা আইন বলবৎ করা যায় না তাকে আন্তর্জাতিক আইন বলা অর্থহীন। তা ছাড়া পরিবেশ সমীক্ষার উদ্দেশ্য প্রকল্প বন্ধ করা নয়, বড়জোর প্রকল্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা। ভারতের কাছ থেকে প্রকল্পের নকশা দাবি, তথ্য চাওয়া ও যৌথ ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানে টিপাইমুখ বন্ধ করা নয়, খানিক সংশোধন করে তার বাস্তবায়ন। সেটা অনেকে খোলামেলাই বলছেন। এমনকি এই প্রস্তাবও দিচ্ছেন যে আমরা আরো বুদ্ধিমান হয়ে দিল্লির কাছ থেকে টিপাইমুখ প্রকল্প থেকে বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ পেতে পারি কি না সেই চেষ্টা করা দরকার।

 

যাঁরা দিল্লির কায়কারবারে বিব্রত হয়ে মেরেছ কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না’ ধরণের দিল্লি-প্রেমের জায়গা থেকে কথাগুলো বলছেন তাঁদের কাছ থেকে বিনয়ের সঙ্গে তফাত থাকাই জনগণের কর্তব্য। তারা এখন নিজেদের মুখ বাঁচাবার জন্য নানান কথা বলতেই পারেন।

এই দিকগুলো এই মুহূর্তে সামনে আনার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণকে সংঘবদ্ধ ভাবে দিল্লির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ও রুখে দাঁড়ানোর অন্য কোন বিকল্প নাই- এই দিকটি স্পষ্ট করা এবং এই বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের মুক্ত করা। ফারাক্কা থেকে পানি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের প্রশ্নে দিল্লির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী হতে পারে সেই শিক্ষা আমরা পেয়েছি। সেটা বুঝতেন বলেই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা মার্চ করেছিলেন। বাংলাদেশের প্রতি দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গির কোন পরিবর্তন হয় নি। যে সাময়িক দিল্লি-প্রেমে বাংলাদেশ উতালা হয়ে গিয়েছিল তা উবে যাওয়ার ফল খারাপ হবে না, যদি আমরা টিপাইমুখ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের নাগরিকদের সঙ্গে দুই দেশে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ রুদ্ধ করা ও বৃহৎ ড্যামের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে পারি। এটাই পথ। পানি, প্রাণ ও পরিবেশ রক্ষার লড়াই বিকশিত করা ছাড়া সামনে আর কোন পথ খোলা নাই।

 

বাংলাদেশের দিল্লিওয়ালাদের সম্পর্কে সাবধান থাকা দরকার।

 

[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২২/১১/১১]