ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৩৩:২৭
বার্তা »
  

তবে স্বাধীনতাই কি যুদ্ধাপরাধ?


 

গত মঙ্গলবার ছিল ১৫ নভেম্বর। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক ভোট ডাকাতির যুগপূর্তির দিন। আমাদের গামছার দল যথোপযুক্ত গুরুত্ব সহকারে দিনটি পালন করতে যাদবপুর ইউনিয়নের এয়ারপোর্ট বাজারে এক জনসভার আয়োজন করেছিল। সেই সভায় স্বতঃস্ফূর্ত লোক সমাগম দেখে পাহাড় ভরের মানুষের প্রতি আমার হৃদয়-মন কৃতজ্ঞতায় ভরে গেছে। পরদিন ছিল এয়ারপোর্ট বাজারের হাটবার। কি কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব শওকত মোমেন শাহজাহান ১৬ তারিখে সভা ডেকে ছিলেন। সরকারি দল তারা ইচ্ছে করলে নিশ্চয়ই সভা ডাকতে পারেন। কিন্তু হাট বন্ধ করে ইজারাদারদের রুটি-রুজি মারা মোটেই কোনো কাজের কাজ নয়। আর সরকারি দলের সভা হলে স্কুল-কলেজ মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক সভায় যেতে হবেএটা কোনো গণতন্ত্রের শুভ ইঙ্গিত নয়। শুধু স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা বন্ধ না, ১০০ দিনের কর্মসূচিতে যেসব দৈনিক শ্রমিক চেয়ারম্যান-মেম্বারদের অধীনে কাজ করে তাদেরও কাজ ফেলে সভায় এনে লোক সমাগম করা হয়েছিল।

 

সভা কেমন হয়েছে তা তিনি নিজেই জানেন। তবে পশ্চিমে বেড়বাড়ী, পূর্বে নলুয়া রাস্তা বন্ধ করে হাজার হাজার মানুষকে কষ্ট দেয়ার ফল ভদ্রলোক আগামীতে নিশ্চয়ই পাবেন। সেই মিটিংয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল, কাদের সিদ্দিকী যুদ্ধাপরাধী। শওকত মোমেন শাহজাহানের ওই উক্তিতে আমি যতটা না বিরক্ত ও মর্মাহত হয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যথিত হয়েছি জাতীয় নেতা মনসুর ভাইর ছেলে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ নাসিমকে সামনে বসিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি স্বাধীনতার প্রতি সর্বোপরি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অমন জঘন্য অপবাদ দেয়ায়। কয়েক মাস আগে দাড়িয়াপুরের জিনের হাটখোলায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভায় টাঙ্গাইলের এক নেতা শওকত মোমেন শাহজাহানকে শয়তান মোমেন শাজাহান বলেছিল। সেই সভায়ই আমি তাকে ভীষণ তিরষ্কার করেছিলাম। এমনকি আবার অমন করলে তাকে দল থেকে বের করে দেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন যদি আবার কোনো নেতা শওকত মোমেন শাহজাহানকে ইবলিশ বলে আমি তাকে ফেরাব কি করে? ১৮ তারিখ সখীপুর গিয়েছিলাম। অনেক মানুষ বলেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তো এত দলাদলি ছিল না। সখীপুরের ৪০-৫০ মাইলের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ রাজাকার ছিল না। সবাই ছিলাম কাদেরিয়া বাহিনী। অভিযোগকারী বর্তমান এমপিও আপনার অধীনে ছিল। তাহলে কি চর-ভর-পাহাড়ের সব মানুষই আমরা যুদ্ধাপরাধী? আমরা আওয়ামী লীগার হিসেবে অনেকে যুদ্ধ করেছি। তাহলে আওয়ামী লীগও কি যুদ্ধাপরাধী? আমাদের নেতা জাতির পিতাও কি যুদ্ধাপরাধীর অপবাদে অভিযুক্ত হবেন? হৃদয় ভাঙা পাহাড়ের মানুষের প্রশ্নের পর প্রশ্ন শুনে বড় বেশি ব্যাকুল হয়েছি। অপেক্ষায় আছি দেখি মহান মহাজোট সরকার লাগামহীন এসব কথাবার্তার কি বিচার করে। একটু সময় তো অবশ্যই দেয়া দরকার।

 

১৭ নভেম্বর ছিল আফ্রো এশিয়া লাতিন আমেরিকার মুক্তিদূত মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। অবহেলা আর অনাদর কাকে বলে। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর দিন না দেখলে হয়তো বোঝা যেত না। ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতার পর আসামের মুখ্যমন্ত্রী জনাব সাদুল্লাহ সরকার বলেছিলেন, পাকিস্তানকে শায়েস্তা করা এবং উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য এক মওলানা ভাসানীই যথেষ্ট। ক্ষমতার গরমে আজ আওয়ামী লীগের অনেকেই বুঝতে চেষ্টা করে না মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী আর বিপ্লবী জননেতা শামসুল হক না হলে আওয়ামী লীগ হতো না। আওয়ামী লীগ না হলে, মওলানা ভাসানীর পুত্রস্নেহ না পেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালি জাতির হৃদয়াসনে মুকুটহীন সম্রাটের মর্যাদা পেতেন না। তাতে করে আমরা স্বাধীনতাও পেতাম না। সেই মহান নেতা মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবরের পাশে ফাতেহা পাঠ করতে কোনো মন্ত্রী যায় না। ডিসি-এসপিরা পিয়ন দিয়ে ফুলের গুলদস্তা পাঠায়। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁরই নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ খোলা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্মানজনক কোনো অনুষ্ঠান করে না। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাজারে ফুল দিলেও তার সঙ্গে যারা গিয়েছিলেন তারা কতটা শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রশ্নটা থেকেই যায়। আমরা এমন অধঃপতনে তলিয়ে যাচ্ছি, আমাদের পূর্বপুরুষদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা নির্লোভ ফাতেহা পাঠও করতে পারি না। জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সময় হুজুরেরই অনুসারী ছিলেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একজন রুচিশীল ভদ্র মানুষ তিনি। তাকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে মাজারের পাশে বিএনপির সমাবেশের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? মহান নেতা মওলানা ভাসানীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন, নাকি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির রাজনৈতিক অস্তিত্ব জাহির? সবকিছুতেই কেমন যেন ভেজাল আর ভেজাল। কবে যে এ থেকে জাতি পরিত্রাণ পাবে ভেবে কূল-কিনারা পাই না। এই মহান নেতার ওফাত্ দিনে পরম প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আল আমীনের কাছে কায়মনে প্রার্থনা করি তিনি যেন এই অলি-এ-কামেলকে বেহেস্তবাসী করেন এবং এই মহান দিনের অছিলায় আমাদের বিবেকের পথে চলার হেদায়েত নসীব করেন।

 

১৮ নভেম্বর শুক্রবার সখীপুর গিয়েছিলাম প্রতিমাবংকীর সংগ্রামী যুবনেতা জাহাঙ্গীর আলম এবং বোয়ালীর সাবেক ইউপি মেম্বার রফিকুল ইসলাম হায়দারকে দেখতে এবং দলের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাতে। দরিদ্র জাহাঙ্গীরের প্রতিমাবংকীর বাড়িতে শত শত নারী-পুরুষের কলরবে ঠাসা সবার আন্তরিকতা দেখে হৃদয় ভরে গেছে। এর আগে বাসার পাশের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে মামাতো ভাই এটিএম সালেক হিটলুর মেয়ের বিয়ের দাওয়াত খেয়ে ৩টা ৯ মিনিটে সখীপুরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। সত্য কথা বলতে কি, কোথাও কোনো রাস্তাঘাট ভালো না। সবদিকে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা। টাঙ্গাইল থেকে ঘারিন্দা সুরুজ-আইসড়া-পাইকড়া-রামপুর-গান্ধিনা-তেজপুর-কালিয়ান-বেতুয়া-সংগ্রামপুর হয়ে সখীপুরের দূরত্ব বড়জোর ২৫ কিলোমিটার। আগে লাগত সারাদিন, এখন লাগে দেড় ঘণ্টা। অথচ রাস্তাঘাট ভালো হলে সময় লাগা উচিত ৩০-৪০ মিনিট। ২৫ কিলোমিটারের প্রায় ২০ কিলোমিটারই পাকা। দুর্ভাগ্য কাঁচার চেয়ে পাকাতেই বেশি খারাপ। আর ক’দিন মেরামত না হলে রাস্তার চেয়ে রাস্তার আশপাশ দিয়ে চলাই আরামদায়ক হবে। জাহাঙ্গীরদের বাড়ি যাওয়ার পথে সখীপুর তালতলা মোড়ে ছাত্রলীগের এক সভা দেখলাম। যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচারে তারা সভা আহ্বান করেছে। রাস্তার মধ্যে কয়েকটা চেয়ার ফেলেছিল। তাও খালি। সভার মধ্যমণি স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব শওকত মোমেন শাহজাহান। শুক্রবার সখীপুরের হাটবার। এমনিতে তালতলা চত্বরে গিজগিজে লোক থাকে। তারপরও সভায় খুব একটা লোক ছিল না। অনেক চেয়ার খালি। আর শ’য়ের বেশি যে চেয়ার দিয়েছিল তাও নয়। জায়গাটা পার হতে দু’তিন মিনিট সময় লেগেছে। ওর মধ্যে পর পর চার-পাঁচজনের নাম ডাকা হলো, তারা কেউ ছিল, কেউ ছিল না। যারা ছিল তারা বক্তৃতা করল না। আমরা যখন সভার কাছাকাছি পৌঁছি তখন একটা ছেলে বক্তৃতা করছিল। আমি তার নামধাম জানি না, দেখিওনি। তবে মিনিট দুই খুব গালাগালি শুনেছি। ওরকম গালাগালি বর্তমানে সংসদেও খুব একটা হয় না। এমনিতেই আমি দেরি করে বিয়ে করেছি, সে কারণে আমার ছেলের বয়স কম। তার চেয়েও কম বয়সী কেউ গালাগাল করছিল। কি করে বলি আমি না থাকলে হয়তো ওই ছেলের মা সতী নারীর ঘরে জন্মাত না। অথবা তার মায়ের মা’র ইজ্জত সম্ভ্রম রক্ষা পেত না। তার পিতা হয়তো ভিন দেশির ঔরসে জন্ম নিত। অহেতুক গালাগালি শুনে যে কখনও সখনো কিছুই মনে হয় না তা নয়। যাদের মুখে শোভা পায় না তাদের মুখ থেকে দুর্ভেদ্য গালাগালি শুনে কিছুটা তো খারাপ লাগেই। সখীপুরে এখন আর তাল গাছ নেই, তাই তালতলাও নেই। স্থানীয় সংসদ সদস্য ওইখানে একটা ভালো শৌচাগার বানাতে চেয়েছিল। কি কারণে বানানো হয়নি বলতে পারব না।

 

নওমুসলিমরা অতিরিক্ত নামাজ পড়তে পারলে খুশি হয়। অনেকের সহানুভূতি অর্জনের জন্য যেখানে-সেখানে নওমুসলিমরা নিজেকে নওমুসলিম বলে বার বার পরিচয় দেয়। ওরকমই সংসদ সদস্য হয়ে কনসার্টে কনসার্টে তার নির্বাচনী এলাকা একেবারে ঝালাপালা করে ফেলেছে। গত তিন বছর কখনও কিছু বলিনি। এখন বলার সময় এসেছে। ভরের পাহাড়ের মানুষও চায় তাদের পাহারা দেই। ২০০৮ সালে তাদের গামছায় তারা ভোট না দিয়ে নিজেরাই এখন ব্যথিত-মর্মাহত। তাই মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য গামছা মার্কার দল করেছিলাম। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে আর চলে না। সে জন্যই ৯৯-এর ১৫ নভেম্বর ভোট ডাকাতির যুগপূর্তি দিবসে যাদবপুরের এয়ারপোর্ট বাজারের বিশাল সভার পোস্টার নিয়ে বাহাজের কারণে প্রতিমাবংকীর জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করে অবৈধভাবে থানার গারদে রাখা হয়েছিল। একজন নির্যাতিত গামছার দলের কর্মীকে সম্মান জানাতেই গরিবের বাড়ি গিয়েছিলাম। তাদের বাড়ির সামনে অত লোক হবে তারাও আশা করেনি, আমিও করিনি। পাকিস্তান আমলে খালি গলায় তিন-চার হাজার মানুষের সামনে চিত্কার করে বক্তৃতা করতে কোনো কষ্ট হতো না। মানুষজন শুনল কি শুনল না এ ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপও ছিল না। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে, তাই খালি গলায় অত মানুষের সামনে চিত্কার করে বক্তৃতা করতে কষ্ট হয়। কিন্তু লোকজন হলে কথা না বলে উপায় থাকে না। কিছু না বলে চলে এলে মানুষ বড় আহত হয়। অনেক সময় কথা কিছু না। আবার কোনো কোনো সময় কথাই অমৃতের চেয়ে মিষ্টি। তা না হলে জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাবিবদের ব্যান্ড অন্যদিকে মমতাজ, বারী সিদ্দিকী, কিরণ চন্দ্র রায় গং বাউলদের গান শুনতে হাজার হাজার মানুষ একত্র হবে কেন? প্রতিমাবংকী স্কুল মাঠে খালি গলাতেই দু’কথা বলছিলাম। আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য আমাকে যুদ্ধাপরাধী বলায় দু’দিন বেশ মনোকষ্টে ছিলাম। মনে করেছিলাম ওটা শুধু আমাকেই বলেছে। কিন্তু আমার বক্তৃতার এক পর্যায়ে কয়েকজনের কথায় আমার অন্তর নড়ে গেল। সত্যিই তো সংসদ সদস্য তো শুধু আমাকে যুদ্ধাপরাধী বলেননি। যুদ্ধের সময় আমাদের কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ বলেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরের আমার কর্মকাণ্ড নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। আমি যুদ্ধাপরাধী হলে যুদ্ধের সময় করা কর্মকাণ্ড হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ। বেশ কয়েকজন বয়সী চিত্কার করে বলছিল তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার সঙ্গে আমরা যারা ছিলাম তাদের সবারই তো বিচার হওয়া উচিত।

 

এখনকার মতো তো তখন সখীপুরে কোনো দলাদলি ছিল না। সব হয়েছে স্বাধীনতার পরে। সখীপুরের ৫০ মাইলের মধ্যে চার-পাঁচজন ছাড়া আর কোনো রাজাকার ছিল না। আমরা সবাই ছিলাম কাদেরিয়া বাহিনী। আপনার হুকুমে যুদ্ধ করেছি। তাহলে তো সমস্ত পাহাড় মানে সখীপুরের মানুষদের বিচার হওয়া উচিত। আমরা সবাই আপনার সঙ্গে ছিলাম তাহলে আমরা সবাই যুদ্ধাপরাধী। এখানকার যে এমপি সেও আপনার অধীনে ছিল, তারও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হওয়া উচিত। লোকজনের কথা শুনে চিন্তার দুয়ার খুলে গেল। সত্যিই তো এ্যাং উদে ব্যাঙ উদে খইলসা কয় আমিও উদি। আজ না হয় জনে জনে নেতা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা কেউ ছিল না। তখনকার সত্যিকারের নেতা যারা ছিল তারাও পালিয়েছিল। সমস্ত ভর পাহাড় আমার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হানাদারদের প্রতিরোধ করেছে। সারা পৃথিবী যার স্বীকৃতি দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড যদি যুদ্ধাপরাধ হয় তাহলে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকার গঠন আরও বড় অপরাধ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার নেতা, পিতা। তাঁর হাতে সমস্ত অস্ত্র তুলে দিয়েছি। আমার গুনেরও যেমন ভাগিদার তিনি, আমার দোষেরও তো অংশীদার তিনি। ভদ্রলোক এই সেদিন পর্যন্ত আমার পিছে পিছে অপ্রয়োজনে ঘুরেছেন। বেঁচে থাকলে তার পদ চলে গেলে তিনি আবারও ঘুরবেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীনতাকে এভাবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা একি যুদ্ধাপরাধীদের কাছ থেকে কোনো উপঢৌকন পেয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচিয়ে দেয়ার কোনো ষড়যন্ত্র?

 

তা না হলে এমন ন্যক্কারজনক কথা বলেন কেন? সব কথারই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে। এ কথারও আছে। বর্তমান সরকারের আমলে কারোরই মান-ইজ্জত নিরাপদ নয়। বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে যে ভাষায় কথা বলে তা ভাবাই যায় না। সরকারি দল বিরোধী দলকে যেভাবে গালাগাল করে পৃথিবীর আর কোনো সভ্য সমাজে এর কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাদের সিদ্দিকীও যুদ্ধাপরাধী এমনটি বলে আকারে-ইঙ্গিতে ভদ্রলোক নিজেকে রাজাকারে পরিণত করেছে। কারণ রাজাকার ছাড়া আর কারও মুখে অমন কথা মানায় না। আওয়ামী লীগের ইদানীংকালের পাতি নেতারা যখন জিয়াউর রহমানের উপর অভিযোগ আনতে গিয়ে বলতে চেষ্টা করে মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানিদের ঢুকিয়ে দেয়া এজেন্ট। কথাটা মোটেই আওয়ামী লীগ এবং তার সরকারের জন্য সুখকর নয়। জিয়াউর রহমানের মতো একজন মুক্তিযুদ্ধের বীরকে যদি অবমূল্যায়ন করতে গিয়ে পাকিস্তানের এজেন্ট বানানো হয় তাহলে স্বাধীন বাংলা সরকারের ব্যর্থতার কোনো কূল-কিনারা থাকে না। পাকিস্তানি এজেন্টের নামে জেড ফোর্স বলে ব্রিগেড গঠন বিপ্লবী সরকারের জন্য একটি অমার্জনীয় ব্যর্থতার অপরাধ। ঠিক একইভাবে ১৯৭৩ সালে বিজয় দিবসে জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা বঙ্গবন্ধুর জন্য অমার্জনীয় ব্যর্থতা। আসলে দেশ স্বাভাবিকভাবে চললে যারা এখন উপজেলা স্তরের নেতাও হতে পারতেন না তারা এখন মন্ত্রিসভায় জাঁকিয়ে বসে। দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে যখন যা খুশি তাই বলছেন। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হবে, এটা পাকিস্তানি গোয়েন্দা তো দূরের কথা, গোয়েন্দাদের বাপ-দাদারও চিন্তার বাইরে ছিল। ভীতু বাঙালি অস্ত্র হাতে নেবে, এটা ছিল পাকিস্তানিদের কাছে অভাবনীয় ব্যাপার। চিটাগং থেকে জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বিষয়টা ছিল পরিবেশগত কারণে স্বতঃস্ফূর্ত। ওই সময় পাকিস্তানি কোনো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যেতেন কিনা চিন্তা করার বিষয়। তাই একজনকে অপমান করতে গিয়ে জাতিকে অপমান করা, সেই সঙ্গে জাতির পিতাকে অপমান অপদস্ত করা এটা ভালো কথা নয়। ক’দিন আগে আমাদের একমাত্র নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসকে অপমান অপদস্ত করে আমরা কেউ সম্মানিত হইনি।

 

সেখানে বরং আমরা আমাদের নিজেদের দৈন্যতারই পরিচয় দিয়েছি। আমরা আর কিছুদিন দেখব। সংসদ সদস্য পদের উন্মাদনায় বেহাল জনাব শাহজাহান নিজ দায়িত্বে সখীপুর-বাসাইলবাসীকে যদি যুদ্ধাপরাধী বলে থাকে, মুক্তিযুদ্ধকে যুদ্ধাপরাধ বলে থাকে তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রধান খাদেম হিসেবে তার বিচার করবেন। আর কিছু না হোক দল থেকে বের করে দেবেন। আর যদি দেখা যায় বেহুশ সংসদ সদস্যের কথায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে তাহলে তার পিতাও এই অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। মুক্তিযুদ্ধ অপমানিত হবে, মুক্তিযোদ্ধারা অপমানিত হবে। সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা কলঙ্কিত হবে। পাগলের হাতে খুন্তা দিয়ে নিরাপদে থাকা যায় না। তাকে সামলাতেই হয়। দেশবাসীকেও এ বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে বিষয়টা নজরে আনতেই হবে। দেখি সময় থাকতে বেহুশদের হুশ হয় কিনা। আর সময় থাকতেই হুশ না হলে প্রতিবেশী ভারত টিপাই বাঁধ নির্মাণ চুক্তি করে ফেলেছে, আরও কত কিছু করবে। তাই সমালোচকদের বিদ্যুত্ লাইন কেটে দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুস্থির থাকতে পারবেন কি? শান্তভাবে একটু ভেবে দেখবেন। সরাসরি সম্প্রচারিত একটা অনুষ্ঠানে ওভাবে কথাটি বলায় আপনার সম্মান বেড়েছে না কমেছে? এটাই ছোট ভাই হিসেবে ২০১১ সালের শেষ পরামর্শ।

 

[সূত্রঃ আমার দেশ, ২২/১১/১১]