ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮, বৃহস্পতিবার বিকাল; ০৫:৩৩:০৭
বার্তা »
  

-ঃ সুরা আল মূমিনুনঃ- (মক্কায় অবতীর্ণ) দারস = ১-১১ আয়াত

28 Nov 2011

.

সরল অনুবাদঃ
১)    নিশ্চিত ভাবেই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা।
২)    যারা নিজেদের নামাযে বিনয়ী ও নম্র।
৩)    যারা বাজে বা বেহুদা কথা কাজ থেকে দুরে থাকে।
৪)    যারা তাজকিয়া বা পরিশুদ্ধির ব্যাপারে কর্মতৎপর হয়।
৫)    এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।
৬)    তবে তাদের স্ত্রীদের ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে না রাখলে তারা তিরস্ড়্গৃত হবে না।
৭)    তবে যদি কেউ তাদের ছাড়া অন্য কাউকে (যৌন ক্ষুধা মেটাবার জন্য) কামনা করে তবে তারা হবে সীমালংঘনকারী।
৮)    এবং যারা তাদের আমানতসমূহ এবং ওয়াদাচুক্তির (অঙ্গীকার) রক্ষনাবেক্ষন করে।
৯)    এবং যারা তাদের নামাযসমূহ যথাযথভাবে সংরক্ষন করে।
১০)    তারাই (এসব গুনের অধিকারী) উত্তরাধিকার লাভ করবে
১১)    তারা উত্তরাদিকার হিসাবে ফিরদাউস পাবে এবং সেখানে চিরদিন থাকবে।

নামকরনঃ সুরার নামকরন দুই ভাবে হয়ে থাকে-
১·    বহুল আলোচিত শব্দ (শব্দ ভিত্তিক) নাস, ফালাক
২·    বিষয়ভিত্তিক - সুরা ফাতেহা, ইখলাস

এ সুরাটি ১ম আয়াতের আল মুমিনুন শব্দ থেকে নামকরন করা হয়েছে।

নাযিলের সময়কাল/ শানে নূযুলঃ
সুরার বর্ণনাভঙ্গি ও বিষয়বস্তুর উৎস হতে এটি প্রমাণিত হয় যে, এটি নবী (সাঃ) এর মাক্কী জীবনের মাঝামাঝি সময়ে নাযিল হয়েছে।
প্রেক্ষাপটে এ কথা স্পষ্ট যে,
এ সময় নবী (সাঃ) ও কাফেরদের মধ্যে দ্বন্দ চলছিল কিন্তু তখনও অত্যাচার চরমে পৌছেনি।
(৭৫-৭৬) আয়াত থেকে- মক্কায় দুর্ভিক্ষের সময় মাক্কী যুগের মধ্যভাগে।

উরওয়া ইবনে জুবাইর (রাঃ) এ সুরাটি নাযিল হবার পূর্বেই উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি আবদুর রহমান ইবনে আব্দুল কারীর বরাত দিয়ে হযরত উমর (রাঃ) উক্তি উদ্বৃত্ত করেন। উমর (রাঃ) বলেন- ‘একদিন ওহীর বিশেষ অবস্থা (মৌমাছির ন্যায় গুঞ্জনের) লক্ষ্য করে ওহী শোনার জন্য থেমে গেলাম। ওহীর অবস্থা কেটে গেলে রাসূল (সাঃ) বলেল এক্ষনে দশটি আয়াত নাজিল হয়েছে। যদি কেউ এ আয়াতগুলি পুরোপুরি পালন করে সে সোজা জান্নাত যাবে। অতপর তিনি উপরোল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করে শোনান।

বিষয়বস্ত ও আলোচ্য বিষয়ঃ
এই সুরাটির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্য।
তিলাওয়াতকৃত ১১টি আয়াতের মূল বিষয়বস্তু হলো, যেসব লোক এই নবীর কথা মেনে নেবে, তাদের মধ্যে এসবগুন সৃষ্টি হবে আর নিঃসন্দেহে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ লাভ করবে।
ইমাম নাসাঈ তার কিতাবের তাফসীর অধ্যায়ে ইয়াজীদ ইবনে কাবনুস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ) কে প্রশ্ন করেছিলেনঃ রাসূল (সাঃ) এর চরিত্র কেমন ছিল? তিনি বলেন, তার চরিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে। অতঃপর তিনি এই দশটি আয়াত তেলাওয়াত করে শোনান। এবং বলেন এসব ছিল রাসূল (সাঃ) এর চরিত্র।

পটভূমিঃ অত্র সুরা বিশেষ করে তেলাওয়াতকৃত আয়াতগুলো নাজিলের মক্কার কাফেররা যেমন ছিল ইসলামের চরম বিরোধী তেমনি পার্থিব উপকরণ সব ছিল তাদের হাতের মুঠোয় (বাণিজ্য)। অপরদিকে মুসলমানদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। (আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানগত)
এই অবস্থায় কাফেররা নিজেদের অধিক সফল এবং মুসলমানদের ব্যর্থ মনে করত। তখন মুমিনদের প্রকৃত সফলতার ঘোষণা দিয়ে এ আয়াতগুলি নাজিল করেন।

প্রকৃত সফলতার অর্থঃ তাফসীর কারকগণ ব্যাখ্যা করেছেন কোন একটি সুন্দর দালানে এক ব্যক্তি ৫দিন থাকতে পারবে এবং যদি কুড়েঘরে থাকে তবে সারাজীবন থাকতে পারবে- এক্ষেত্রে একজন বুদ্ধিমান কোনটি বেছে নেবে।
অথচ আখেরাতে চিরজীবনের জন্য সুন্দর ব্যবস্থা আছে।

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাঃ
অর্থঃ নিশ্চিত ভাবে সফলকাম হয়েছে মুমিনরা।
এখানে মুমিন বলতে তারা যারা রাসূল (সাঃ) এর উপর ঈমান এন তার আনীত বিধান মেনে নিয়েছে এবং তার দেখানো জীবনপদ্ধতি অনুসরন করেছে।
“নিশ্চিতভাবেই সফলতা লাভ।”  
দিয়ে বাক্য শুরু করার তাৎপর্য বুঝতে হলে নাজিলের পরিবেশকে সম্মুখে ব্যাখ্যা দরকার।
১)    কাফিরদের ইসলাম বিরোধীতা।
২)    সামাজিক ও আর্থিক উন্নতি।
৩)    মুসলমানদের সামাজিক ও আর্থিক পশ্চাতপদতা।

>    আল্লাহ যখন এই মুসলমানদেরই সফল বললেন তখন বোঝা যায় আল্লাহর নিকট সফলতার মানদন্ড ঈমান অর্থ নয়। প্রকৃত সাফল্য আখেরাত। (পূর্ব দ্রষ্টব্য)

আল কোরআনে সাফল্যঃ ব্যবস্থা-পত্র
অর্থঃ যে নিজেকে পাপ থেকে পবিত্র রেখেছে সেই সফল।
সফলতা লাভের জায়গা আখেরাত-  
অর্থাৎ (হে মানুষ) তোমরা দুনিয়াকেই পরকালের উপর অগ্রাধিকার দিচ্ছ। অথচ দুনিয়ার তুলনায় আখেরাতের জীবন অতি উত্তম এবং স্থায়ী।
    আলোচ্য আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়লা সেসব মুমিনকে সাফল্য দান করার ওয়াদা করেছেন। যারা আয়াতে উল্লিখিত সাতটি গুনে গুনান্বিত। পরকালের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য এবং দুনিয়ার সম্্‌ভাব্য সাফল্য সবই এই ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত।

মুমিনদের সাতটি গুনঃ সর্বপ্রথম গুন হলো ঈমানদার হওয়া। কিন্তু এটা একটা বুনিয়াদী ও মৌলিক বিষয় বিধায় এটাকে এই সাতটি গুনের মধ্যে শামিল না করে পর পর সাতটি গুন বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রথম গুনঃ অর্থøাৎ ‘যারা তাদের নামাযে বিনয়ী নম্‌্র।”
নামাযে খুশু বলতে বিনয়ম নম্র হওয়া বুঝায়। খশুর আভিধানিক অর্থ স্থিরতা। শরীয়তের পরিভাষায় এর মানে অন্তরে স্থিরতা থাকা। অর্থøাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর কল্পনা অন্তরে ইচ্ছাকৃত ভাবে না করা এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্থির রাখা।
    দিলের খুশু হয় তখন যখন কারো ভয়ে বা দাপটে দিল ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। আর দেহের খুশু এভাবে প্রকাশ পায় যে, কারো সামনে গেলে তার মাথা নিচু হয়ে যায়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হয়ে পড়ে চোখের দৃষ্টি নত হয়ে আসে, গলার স্বর ক্ষীণ হয়ে যায়।
    হাদীসে হযরত আবু যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) বলেন- নামাযের সময় আল্লাহ তায়ালা বান্দার প্রতি সর্বক্ষণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন যতক্ষণ না নামাযী অন্যদিকে ভ্রুক্ষেপ করে। যখন সে অন্যকোন দিকে ভ্রুক্ষেপ করে তখন আল্লাহ তায়ালা তার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। (নাসায়ী) (আবু দাউদ)
>    করীয়তে বর্ণিত নামাযের নিয়ম নীতি নামাযে খুশু পয়দা করতে সাহায্য করে।

যেসব কাজে নামাযে খুশু সৃষ্টিতে বাধা দেয়ঃ
(১)    নামাযের মধ্যে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে খেলা করা বা নাড়াচাড়া করা।
হাদীস- একবার নবী (সাঃ) এক ব্যক্তিকে নামাযের মধ্যে মুখের দাড়ী নিয়ে খেলা করতে দেখে বললেন- “যদি এ লোকটির দিলে খুশু থাকত তাহলে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের উপরও খুশু থাকত। (বায়হাকী)
(২)    নামাযে এদিক ওদিক তাকালে নামাযে একগ্রতা বা খুশু নষ্ট হয়ে যায়। এ সম্পর্কে নবী (সাঃ) বলেন- এটা নামাযীর (মনোযোগের) উপর শয়তানের থাবা।
(৩)    নামাযে ছাদ বা আকাশের দিকে তাকালে নামাযের খুশু নষ্ট হয়ে যায়। নবী করিম (সাঃ) বলেন- লোকেরা যেন নামাযে তাদের চোখকে আকাশমুখী না করে। (কেননা তাদের চোখ) তাদের দিকে ফিরে নাও আসতে পারে।
(৪)    নামাযে হেলা-ফেলা করা ও নানাদিকে ঝুকে পড়া।
(৫)    সিজদায় যাবার সময় বসার জায়গা বা সিজদার জায়গা বার বার পরিস্ড়্গার করলে নামাযের একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যায়। (তবে ক্ষতিকারক হলে একবার সরানো যাবে)
মহানবী (সাঃ) বলেন- কোন ব্যক্তি যেন নামাযের অবস্থায় (সিজদার জায়গা হতে) কংকর না সরায়। কেননা আল্লাহর রহমত নামাযী ব্যক্তির উপর প্রসারিত হয়। (আহমেদ, নাসায়ী, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাযাহ)
(৬)    একটানা গর্দান খাড়া করে দাড়ানো এবং খুব কর্কশ স্বরে কোরআন পড়া কিংবা গীতের স্বরে কুরআন পাঠ।
(৭)    জোরে জোরে হাই এবং ঢেকুর তোলা। ইচ্ছা করে গলা খেকরা বা কাশি দিলে নামাযের একাগ্রতা নষ্ট হয়।
রাসূল (সাঃ) বলেন- নামাযে হাই ওঠে শয়তানের প্রভাব থেকে যদি কারো হাই ওঠে তার উচিত সে যেন সাধ্যমতো হাই প্রতিরোধ করে। (মুসলিম, তিরমিযী)
(৮)    তাড়াহুড়ো করে নামায আদায় করা। নামাযে রুকু সিজদা কিয়াম সঠিক ভাবে আদায় না করা।
নবী (সাঃ) বলেন- মদখোর, ব্যভিচারী ও চুরি করা কবীরা গুনাহ এবং তার সাজাও খুব তবে সবচেয়ে জঘন্য চুরি হলো সেই যে ব্যক্তি নামাযে চুরি করে। সাহাবীরা বললেন নামাযে কিভাবে চুরি হয়। রাসূল (সাঃ) বললেন নামাযে রুকু ও সিজদা ঠিকমতো না করা। (মালেক, আহমেদ, দারেমী)
(৯)    নামাযীর সামনে পর্দায় কোন ছবি থাকলে নামাযে খুশু বা একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যায়।